সাহিত্যCafe – কভার স্টোরি ২

সাবজেক্ট টু মার্কেট রিস্ক
রাজ অধিকারী

● বিশেষ বিজ্ঞপ্তি (একদম মিউচ্যুয়াল ফান্ডের বিজ্ঞাপনের স্টাইলে পড়বেন):
নিম্নলিখিত লেখার মধ্য দিয়ে কোনওভাবে স্বাধীনতা দিবসের আবেগ ও স্বাধীনতা সংগ্রামকে ছোট করা হয়নি। মাইরি বলছি! আপনার দিব্যি! আমি টরেন্ট থেকে নামিয়ে অল্ট বালাজিতে ‘বোস’ দেখেছি। গান্ধীজিও খুব প্রিয় আমার। পিঙ্ক শেড হলে তো কথাই নেই।

ছোটোবেলায় স্বাধীনতা দিবসের ব্যাপারটা আমায় কেউ বলেনি। স্কুলে জিকে বই পড়ার আগে তো জানতামই না আমি স্বাধীন। এদিকে পরাধীন আছি কিনা সেই ব্যাপারেও জানিনা। জিকে বইয়ে পড়ার পরেও আরেক ফ্যাচাং। একটা দুধের শিশুকে, না ঠিক দুধ নয়; একটা বর্ন ভিটার শিশুকে সাত সকালে ঘুম থেকে জাগানো। সাতও নয়, পাঁচসকাল তখন। কয়েকবছর হলো পৃথিবীতে এসেছি। তখনও মুখস্ত হয়নি ঠিকমতো; কে কোন আত্মীয়, আমি কোথায় থাকি, পৃথিবী গ্রহের নাম একটা বাংলা ব্যান্ড থেকে হয়েছে। এমন বয়সে অতো সকাল সকাল ঘুম থেকে তুলে দিয়ে, স্কুল ড্রেস পড়িয়ে স্কুলে পাঠিয়ে দিতেন বাড়ির লোক। একটা লম্বা বাঁশের ওপর তেরঙা একটা কাপড় ঝুলছে। কেন ঝুলছে, কেইবা ওটার ভেতরে ফুল গুঁজে দিয়েছে, ঝুলতে ঝুলতে বাদুড় হবে কিনা, কোনও চাইনিজ মানুষ ওটাকে খাবে কিনা, ওই বয়সে কি করেই বা বুঝবো! তখন মনে হতো স্বাধীনতা দিবসের থেকে আমার জন্মদিন ভালো। সবথেকে বড়ো বেলুনের ভেতরে ফুল নয়, চকলেট গোঁজা থাকতো। বাঙালির জন্মদিন বলে কথা। ভালো জিনিস নিয়ে কেউ ফুলে গেলেই নিচ থেকে ফাটিয়ে দাও। তারপর সেই ফাটানোর ভাগ সবাই ফাটিয়ে পাবে। কেউ কম পেলে আবার ফাটাফাটি কান্ডও হতে পারে।যাই হোক, জন্মদিনটা আমার নয়, দেশের। জন্মদিন বলাটা কি ঠিক? জন্মে তো আগেই ছিল। সেকেন্ড জন্ম বলা যায়। ওই ব্রাহ্মণদের পৈতের মতো। দু’বার জন্ম। দ্বিজ। মানুষের বেলার দ্বিজ হলে ডিজে বাজতেই পারে। তবে দেশের ক্ষেত্রে অশোভনীয়। তারপর হলো পতাকা উত্তোলন। প্র্যাক্টিক্যালি, আগেই উত্তোলিত হয়ে ছিল। স্কুলের প্রিন্সিপাল দড়ি টেনে দিলেন। ভাবুন তো, প্রথমবার যখন কোনও স্কুলে এইটা হয়েছিল! পরদিন খবরের কাগজে হেডলাইন, “নামকরা স্কুলের প্রিন্সিপাল দড়ি টেনে দিলেন।” উঃ বাবারে! ভাবলেই গা শিউরে ওঠে। আচ্ছা সিউড়িতে যারা থাকেন, তারাও কি….যাজ্ঞে, অবান্তর কথা। কথার মাঝে বারবার “আত্মনির্ভর” রিপিট করে লম্বা করতে আমি আসিনি। দড়ি টানার পরেই টুক করে সবাই দ্বাপর বা ত্রেতা কোনও একটা যুগে চলে গেলাম। মানে ফিলটা ঐরকমই। মাথার ওপর ফুলটুল পড়ছে। না না, ফুলই পড়ছে। টুল পড়লে চাপ ছিল। ভগবান না করলেই, নিজের মাথায় পুষ্পবৃষ্টি হচ্ছে, কি ভালোই না লাগে! পুজোর সময় অষ্টমীর দিন সামনে দাঁড়ালে এরকম ফিল আসে। অঞ্জলির ফুল সবাই ছুঁড়ে ছুঁড়ে দিচ্ছে। নিজেকে ঠাকুর ঠাকুর লাগছে। রান্নার বা কবিতার নয়, দেবলোকের। কেউ তো আবার পাকিস্তানের ফাস্ট বলার হয়ে যায় সেদিন। ফুলটাকে ঠাকুর মশাইকে গায়ে এমন জোরে ছুঁড়ে মারে, লাল লাল দাগ হয়ে যায়। আমাদের মনসারাম পুরোহিত তাই লাইফজ্যাকেট পড়ে বসেন। উফঃ, বড্ড অফটপিক হয়ে যাই আমি আজকাল। নেতা হয়ে যাচ্ছি মনে হয়। পুষ্পবৃষ্টির পর জাতীয় সংগীত। তখন কি থোড়াই ওসব মুখস্থ! লিপ সিঙ্ক করে দিতাম। নিজেকে জাস্টিন বিবার মনে হতো। তারপর অনিচ্ছা সত্ত্বেও সেই একই “কারার ওই লৌহ কপাট”, “ওঠো গো ভারতলক্ষী”। আর কত উঠবে! এত সকালে আমাকে উঠিয়ে শান্তি পাওনি? গোটা দেশকে ওঠাতে হবে? একটু বেলার দিকে উদযাপন করলে কি গান্ধীজি লাঠিচার্জ করতেন? এত অত্যাচারের পর আমি কি পেলাম; দু’টো একটাকা দামের চকোলেট। সরকারি হাই স্কুলে এসব মেনে নিয়েছি। কিন্তু প্রাইমারি প্রাইভেট স্কুলে মানবো কেন! বাচ্চাদের সাপোর্ট থাকলে আমিও বয়কট আন্দোলন করতাম। “বাচ্চা অভিযান” চালিয়ে চকোলেট ফ্যাক্টরিতে নিজেই চকোলেট বানাতাম। হিটলারের সাথে হাত মেলাতাম। আগে স্যানিটাইজার মাখতাম অবশ্য। সেই খেজুরদানার থেকেও ছোট চকলেট পেটে দিলাম। তার আগে খালি পেট। বাড়ি ফিরতে ফিরতে চোঁয়া ঢেঁকুর শুরু। মনে মনে, “থালা, শান্তি নেই।” বাচ্চাদের গালিগালাজ আরকি..হেঃ হেঃ। বাড়িতে থেকেও ওই বয়সে স্বাধীন ছিলাম না আমরা। তারওপর আবার কয়েকটা লোক কামানের সাইজের লেন্স নিয়ে ঘুরতো সেদিন। দোকানে বাচ্চা ছেলেমেয়েকে দেখলেই খপাৎ। ছবি তুলে শিশুশ্রমিক ক্যাপশন দিয়ে চালিয়ে দেবে। নাহয় ওদের স্বাধীনতা আরও কম। তাই বলে এইভাবে ছবি তোলার মানে আছে। একটা বড়ো চকলেট খাইয়ে দাও। নাহলে আমার আন্দোলনে যোগ দিতে বলো। তবে স্বাধীনতা জিনিসটা কিন্তু একেক বয়সে একেকভাবে হিট করে। আরেকটু বড়ো হতেই মনে হয় প্রেম করার সুখটাই আসলে স্বাধীনতা। এটা যারা মনে করে, খুব ভুল করে। দু’শো বছরের পরাধীনতার ইতিহাস থেকে এদের শিক্ষা নেওয়া উচিত। ইংরেজরা বেসিক্যালি একটা টক্সিক রিলেশনে ছিল আমাদের সাথে। ওরা হলো সেই মেয়ে বেস্টফ্রেন্ড, যার সাথে আপনি ‘ফ্রেন্ডস উইথ বেনফিটস্’-এ আছেন। বেনিফিট ব্যাপারটাও সেখানে একতরফা। মেয়েটা বাড়িতে আপনার নাম করে তার ক্রাশের সাথে ডেট-এ চলে যাচ্ছে। আপনার কিচ্ছু করার নেই। ভাবলেন অহিংস আন্দোলন করবেন। মেসেজ সিন করে রিপ্লাই দেবেন না। ইগনোর করবেন। কিন্তু সেরকম কাজ হলো না। তারপর এক দুরন্ত বন্ধুর সাথে আপনার আলাপ হলো। সে আপনাকে বললো, “তুই আমাকে তেল দে, আমি তোকে ব্রেক আপের বুদ্ধি দেব।” তারপর অনেক সংগ্রামের পর, ইনস্টাগ্রাম ব্লক করে শেষমেশ আপনি স্বাধীনতা পেলেন। কিন্তু ঐযে, নেপোয় মারে দই। আপনার বুকে গুলির মতো ফেসবুক মেমোরি বিধতে থাকলো। প্রধানমন্ত্রী হওয়ার মতো আপনার বেস্টফ্রেন্ডও সেই মেয়ের প্রেমিক হয়ে গেল। ১৫ই আগস্টের দিন একটা অদ্ভুত প্রজাতি দেখা যায়। বেশিরভাগটাই সোশ্যাল মিডিয়ায়। যেখানে সেখানে পোস্ট করে যাচ্ছে, “আমরা কি সত্যিই স্বাধীন?”, “নারীরা যেদিন স্বাধীন হবে, সেইদিন আমরা স্বাধীন হবো।” এইসব পোস্ট ইংরেজরা দেখলে কনফিউজড হয়ে যায়। দু’হাজারের নোট থেকে গান্ধীজি উদাস হয়ে ভাবেন, আফ্রিকাতেই ভালো ছিলাম।টাকার মধ্যে এই ছবি নিয়ে আমার বড্ড আপত্তি আছে। “ফির হেরা ফেরি” সিনেমায় অক্ষয় কুমার হাজারের নোটের ওপর বসে পড়লেন। ব্যাপারটা কি শোভনীয়? গান্ধীজির মুখের ওপর এইভাবে সন্টামনা ঠেকানো মেনে নেওয়া যায়! জাতির জনককে নিয়ে এইভাবে লজ্জাজনক কাজকর্ম খুবই খারাপ। ছবিতে গান্ধীজির হাতে ডান্ডা থাকলে মজা বুঝতো। পুরোনো পাইলসের ব্যাথা বেরিয়ে যেত। যাই হোক, স্বাধীনতা হরেক রকম। কেউ বসের অত্যাচার থেকে স্বাধীনতা চায়, কেউ বউয়ের বায়না থেকে। কেউ ভাবে মদ খাওয়ার পারমিশনটাই স্বাধীনতা। কারোর কাছে “অনাদর একটা মস্ত স্বাধীনতা।” তেরঙা মাস্ক বেরিয়েছে শুনলাম। আমিও পড়ে ঘুরবো এবার। ইউজ করে এটা ফেলা যাবে না। তুলে রাখবো। মাস্ক পড়া কারোর সাথে দেখা হলেই চেঁচাবো, “জয় হিন্দ!”

Leave a Reply

Your email address will not be published.