হৃদ-যোজক

অরিজিৎ চক্রবর্তী

পাখি ও সরীসৃপের হৃতযোজক হয়ে বেঁচে আছি। এই বেঁচে থাকার ভিতর যেমন একটি পাখি আছে তেমন একটি সরীসৃপও আছে। আমি বহুদিন থেকেই এমনটা ভাবতে শুরু করেছি। হয়তো একা মানুষের ভাবনায় এরকম মরচে রঙের অপরাহ্ন থাকে। আমারও আছে। আমার বন্ধু দীপান্বিতারও আছে! এই থাকা গুলোয় শুধুই যে বিষণ্ণতা আছে এমনটাও নয়। মহুয়া গন্ধের তীব্রতা আর শালের জঙ্গলের সমবেত মর্মর… গভীর রাতের চাঁদ… শিশু পেঁচার কার্নিশে বসে থাকা… মাঝরাতের যৌন আলোড়ন… ! এই প্রত্যেকটি খন্ডকোলাজ ধীরে ধীরে সকালের দিকে এগোতে থাকে। আমার ঘুম পায়। ফেসবুকের ইনবক্স বন্ধ করে শেষ বারের মত প্রোফাইল ফোটোটা দেখি। নিজেকে তাপব্যাপ্তি চলনের মতো মনে হয়! হাসি পায়। ড্রেসিং টেবিলের আয়নায় আটকে রাখা একটা গোলাপী রঙের টিপ অনিবার্য পূর্ণতা নিয়ে তাকিয়ে থাকে।

( ২ )

অতিচেতনার জীবন!  এই জীবনের ভাবনায় নকল ডামির মতো আচরণ করি। হাসতে ইচ্ছে করলে গম্ভীর হয়ে যাই। কাঁদতে ইচ্ছে করলে হেসে ফেলি। সঠিক বুঝতে পারে না কেউ। কেমন যেন সঠিককে বেঠিক করার নেশা। আমাকে এই নেশা পেয়েছে। আমার গন্তব্য তাই গণতন্ত্রহীন। 

গতকাল রাতে অনিন্দ্য ফোন করেছিল। বলেছিলো আগামীকাল দুপুরের মধ্যে একগুচ্ছ কবিতা দিতে। দিইনি। দিতে ইচ্ছে করেনি। মনে হয়েছে আমার সদ্য জন্মানো কবিতা একটি ‘পত্রিকা’ নামক আশ্রয়ে বেশ্যা হয়ে উঠবে। এই কথা শুনে বউ খুব রেগে গেছিল। বলেছিল, ছিঃ যত নোঙরা কথা। নিজের সৃষ্টিকে অসম্মান। চুপ করে থেকেছি। মনে মনে ভেবেছি, সে তো তুমিও বলো কবিতা লিখে হবে কি? না, তেমন কিছু হবে না। সব পূর্ণিমায় চন্দ্রগ্ৰহণ হয় কি?  কবিতা অনেকটা তাই।

অনুগ্ৰহ করে পাঠক আমাকে ভুল বুঝবেন না। এই গল্পে কবির কোনো জীবাণু নেই। শুধু কবিতাহীন একটা কবিতা আছে। গত বছর ‘অরণ্য উৎসবে’ এক প্রতিষ্ঠিত কবি পিয়ালী পালের বুকটা টিপে দিয়েছিল। পিয়ালী পাল কিছু বলেনি। হেসেছে। ভেবেছে এ আর এমন কি! টেপনেরও একটা অচেতন আছে। সেই অচেতনে কত অচিন চুয়িয়ার যাতায়াত। পিয়ালী এভাবেই দেখে বিষয়টাকে। কবিতার সিন্ডিকেট আছে। সেখানে এসব সামান্য ঘটনা। যাইহোক আমার এসব নিয়ে থাকলে চলবে না। পকেট খালি। বেরোতে হবে। রথীনদা ও তার পরিচিত কজন শিলং বেড়াতে যাবে। ওদের একটা ট্যুর প্যাকেজ করে দিতে হবে। এয়ার টিকিট, হোটেল, লোকাল গাড়ি ইত্যাদি সমস্ত কিছু । তাই ব্যারেটো লেনে ননী ঘোষালের কাছে যাব। একমাত্র ননীদা প্যাকেজটা সস্তায় খেলে দিতে পারে! যেহেতু আজ কলকাতায় আছি। তাই দেরি করলাম না। পরশু গড়বেতায় যেতে হবে। ওখানে একটা ভিলেজ ট্যুরিজমের কাজে তদারকি করা প্রয়োজন।

—আরে কবি? ননীদা বলল।

—- বালের কবি। হাতে হ্যারিকেন হয়ে যাচ্ছে।

—– শালা কবি সভায় যাচ্ছো, সুন্দরী কমলাদের সঙ্গে ছবি সাঁটাচ্ছো ফেবুতে। বেশ তো আছো গুরু!

—- অমন মনে হয়।কামাই হচ্ছে না। কাজ আসছে না ঠিক মতো। যাইহোক শোনো একটা শিলং আছে ষোলো জনের। ভালো রেটে খেলিয়ে দাও গুরু। এই সার্কিটটা তোমার হাতের মুঠোয়। তাই তোমার কাছে এলাম।

—- করে দেব, করে দেব। পার্টি কি করে? কি করে মানে? আরে চাকরি না ব্যবসা। এটা দেখেই প্যাকেজ সাজাই আমি।

—- রহস্য কি? বুঝলাম না তো। শোন্ বাঁড়া যদি কর্পোরেট হয় দিলদার প্যাকেজ দাও। ভালো প্লাস। পয়সা পাবে। যদি সরকারি হয় তাহলে মাঝারি। ঘ্যানঘ্যানানি থাকবে না। পঁচিশ বছর কাটালাম ভায়া। মাল আর অম্লান বুঝি।

যাইহোক সন্ধ্যা নাগাদ ননীদাকে সামান্য কিছু টাকা ধরিয়ে কনফার্ম বুকিং স্লিপ নিয়ে বাড়ি ফিরলাম।

( ৩ )

খানিক আগে একটা জলজ্যান্ত খুনের পর আমার শরীর অবসন্ন। বিছানা ছেড়ে চুপিচুপি ছাদের উপর গিয়ে দাঁড়াই। ঠান্ডা হাওয়া গায়ে লাগে। কাছে পিঠে কোথাও একটা পাখি ডাকে নিচু স্বরে। মোবাইলের নেট অন করে দেখি ইনবক্স এ লোডশেডিং। কালো অক্ষরের আত্মহত্যার মতো ‘ছিঃ’ শব্দটা লেখা। আমি সামনের জঙ্গলের দিকে তাকাই। অনুভব করি গাছেদের কথা বলা। মনটা হালকা হতে থাকে। মনে হয় কিছু একটা লিখে ফেলি। কিন্তু লেখা হয়ে ওঠেনা। ভাবনা গুলো এলোমেলো হয়ে যায়। দীপান্বিতার সাথে আর কথা হবে না জানি। দেখা হবে না নিশ্চিত। এজন্য মনখারাপ হলেও আমি আবার বিছানায় ফিরলাম। শব্দ গুলো আরো কাছে আসতে লাগল। ভাবনা গুলো প্রকৃত অস্তিত্বে সেজে উঠল। কেন জানি গণগনির এই সূর্যোদয় আর সূর্যাস্ত আমাকে সব সময় একটা অদ্ভুত রহস্যে প্রভাবিত করে। এইসব এলোমেলো ভাবনায় ধীরে ধীরে ঘুম এগিয়ে আসে। সকাল এগিয়ে আসে।

সকালে আমি শান্ত স্বাভাবিক। তখন কোনো হত্যা নেই। প্রতারণা নেই। একজন দায়িত্ববান রুচিসুলভ পরিবেশ বান্ধব মানুষ আমি। গাছে দল দিই। গাছের সাথে কথা বলি। কবিতা শোনাই নির্ভার গলায়। তারপর প্রুফ দেখতে বসি। বেলা বাড়ে। অনুলেখা ফোন করে। খোঁজ নেয়। অনুলেখা আমার বউ। এখন মেয়ের কাছে থাকে। মেয়ে সদ্য চাকরি পেয়েছে কলকাতায়। বিয়ে হয়নি। তাই মেয়ের কাছেই অনুলেখা থাকে। মেয়ের পাশে মাকে ঠিক মা বলে বোঝা যায় না। এখনো সেই জেল্লা। আমি মাঝে মাঝেই কলকাতায় যাই অনুলেখার টানে।ওর শরীরী উচ্চারণ আমাকে সব কিছু ভুলিয়ে দেয়। নির্জন দুপুরের নগ্নতায় আমি একটা শিশুর মতো আচরণ করি। কিন্তু সমানে সমানে পেরে উঠি না। মাঝেমাঝে মনে হয় এই আটান্ন বছর বয়েসেও এত যৌন আধিক্য কেন আমার? অবশ্য এ নিয়ে আমি গর্ব অনুভব করি। আমার বন্ধু বিপুল পঞ্চাশেই শিথিল।

পাকদন্ডী বেয়ে পাহাড়ে উঠছি। যেন জীবনের দিকে এগিয়ে যাওয়া। ভালোবাসা ব্যাপারটা কেমন যেন। ফাঁদ! মাঝে মাঝে মনে হয় ভালোবাসা শব্দটা না থাকলেই ভালো হতো। অনুভবি শব্দটা তুলনায় ভালো।আমি তোমার প্রতি অনুভবি এটা বরং ভালো। অনুভব শব্দটাকে কখনো প্রমাণ দিতে হয় না। সে তার উপস্থিতি অচিরেই বুঝিয়ে দেয়। ভালোবাসা শব্দটা জটিল। উপস্থিতি প্রমাণ সাপেক্ষে বুঝিয়ে দিতে হয়। তাই আমি তোমাকে ভালবাসি না বলতে কুন্ঠা বোধ করি না। আমি আমার পনেরো বছর আগে গত হওয়া দিদিমাকে এখনো অনুভব করি। আমার দাদুকে অনুভব করি। মৃত কবি বন্ধু অরিন্দম দাস কে অনুভব করি। আজ যেমন দীপান্বিতাকে অনুভব করছি। কেমন আছিস তুই? কোনদিনও আর কথা বলবি না! তোর পায়ের ব্যথা কমেছে! চেন্নাইতে ডাক্তার কি বললো? এখনো তুই কবিতা পড়িস? আমি একটা সিরিজ লিখছি, পাঠাবো হোয়াটসঅ্যাপে। পড়ে জানাস কিন্তু কিছু হলো কিনা। আজ একটা সিনেমা দেখলাম ইউটিউবে। তোকে লিংকটা পাঠাবো। দেখিস। গতকাল রাতে খুব ঢোকাঢুকি দেখলাম। ওই লিংকটাও পাঠাচ্ছি। বর কে ট্রাই করতে বলিস! ও না পারলে আমি আছি। প্লীজ জুতো মারবো বলিস না! গালি দিস না।

এরকম কত কথা আর ইয়ার্কি হয়েছে আমাদের মধ্যে। অদ্ভূত রকমের একটা বন্ধু সুলভ ব্যপার ছিল দীপান্বিতার। আমার সমস্ত কথা কেই হালকা ভাবে নিত। বুঝতো আমি লোকটা ততটা খারাপ নই।

( ৪ )

রুমা ফোন করেছিল। ওর ছেলের একটা চাকরি দরকার। কাউকে বলে যদি কিছু একটা ব্যবস্থা করা যায়। কথা প্রসঙ্গে দীপান্বিতাকে বিষয়টা জানাই। কারণ ও ওর বর কে বলে কিছু একটা ব্যবস্থা করে দিতে পারবে হয়তো। ওর বর অর্ঘ্য খুব সংবেদনশীল ভালো মানুষ। যাইহোক দীপান্বিতার আন্তরিক চেষ্টায় রুমার ছেলের চাকরিটা হয়ে গেল। রুমা ফোন করে সৌজন্য ধন্যবাদ জানালো আমাকে। আর দীপান্বিতার সরল শান্ত মাথায় গরল ঢালতে লাগল। আমাকে নিয়ে যত রকমের নিন্দা হতে পারে। আমার চরিত্র তার প্রধান হাতিয়ার। আমি শুধুমাত্র যৌন তাড়নায় শুধু মেয়েদের সঙ্গে বন্ধুত্ব করি।

শুনে বলেছিলাম , ঠিকই একজন সুস্থ পুরুষের মধ্যে যৌন তাড়না থাকবে এটাই স্বাভাবিক। তাছাড়া আমি যৌন তারকা। আমার অনেক বান্ধবী। অনেক চুদুরবুদুর। তবে তার বেশির ভাগটাই কল্পবিজ্ঞানের বাস্তব জগতের মতো। যাইহোক এসব অভিযোজিত অভিযোগে আমার ছেঁড়া যায়। দীপান্বিতা কে বলে দিই , ন্যাকাচোদার মতো কথা বলিস না। তোর সঙ্গে এই  সাত বছরের সম্পর্কে কতবার চুদিয়েছিস আমাকে দিয়ে? শোন্ আমার চোদন আছে চোদনের ইতিহাস নেই। ব্যস চুপচাপ। আর কথা নেই। ইনবক্স এ হোয়াটসঅ্যাপে কড়ানাড়া নেই। ফলে আমি কিছুটা একা হয়ে গেলাম। কথা বন্ধ হলো। রুমা কেন এমন করলো তা জানার ইচ্ছেও হলো না। আমি নিজেকে অভাবী প্রকোষ্ঠে লুকিয়ে রাখলাম।আর অপেক্ষায় থাকলাম। ছেলেবেলার অপেক্ষার মতো।

 যা খুশি করার দিন ছিল ছেলেবেলায়।পেয়ারা গাছের ডালে দোল খেতে খেতে পেয়ারায় কামড় মেরে সারাদিন কেটে যেত। আমি শুধু কামড়ের অপেক্ষায় থাকলাম। আসলে মানুষ জন্মপ্রতারক। তাই দীপান্বিতা কে রুমাকে ভুলে যেতে থাকলাম। ভুলে যাওয়ার মতো আরোগ্য আর কিছুতে আছে বলে আমার মনে হয় না।

অথচ কামড় গুলো কবিতার় বেঁচে থাকলো। লিখলাম , ‘অতিক্রম যতদূর তুমি তার চেয়েও বেশি তৃষিত ময়ূর!’  আমার জীবনে দীপান্বিতার মৃত্যু হলো। রুমার মৃত্যু হলো। পচা গন্ধ বেরোতে লাগলো।

( ৫ )

অনুলেখা পুজোর ছুটিতে মেয়েকে নিয়ে গড়বেতার বাড়িতে এসেছে । বাড়িতে দুর্গাপূজার প্রস্তুতি তুঙ্গে। একদিন সকালে কাশের জঙ্গলে  রেললাইনের পাশ ধরে হাঁটছি মোবাইল বেজে উঠল! আমি দেখলাম ধরলাম না ফোনটা।

রথীনদা শিলং ভ্রমণের আপডেট দিচ্ছে প্রতিদিন হোয়াটসঅ্যাপে। এখনো পর্যন্ত কোনো ক্যাচাল নেই। সব ঠিকঠাক। ওরা আজ চেরাপুঞ্জিতে রাজাদার হোটেলে থাকবে। বাঙালি হোটেল, ডাল ভাত আলুপোস্তের অভাব হবে না। রথীনদারা কলকাতায় ফিরতে এখনো চারদিন বাকি। এদিকে পঞ্চমীর দিন প্রতিমা আনতে হবে। দুলাল ঢাকি দেখা করে গেছে। অনুলেখা প্রতিদিন কেনাকাটার জন্য বাজারে যাচ্ছে। বাড়িতে পূজোর হৈহৈ। দায়িত্ব অনেক। আমিও তদারকি করছি। দুপুরে আবার ফোনটা এল। নামটা ভেসে উঠলো। ফোনটা তুললাম না। হয়তো অনুভব করলাম না তাই…!

Leave a Reply

Your email address will not be published.