হারিয়ে যাওয়া মানুষ – রমা

তারাশংকর বন্দ্যোপাধ্যায়

কত মানুষই না জীবনে জড়িয়ে থাকে! সবাই যে খুব কৃতিত্বে উজ্জ্বল এবং ব্যতিক্রম, অথবা ভীষণ দাগ রেখে যায় জগতে তা নয়, ভীষণ সাদামাটা অকিঞ্চিৎকর জীবনই হয়তো কাটিয়ে যায় তারা। সময়ের দাবিতে একসময় জীবন থেকে হারিয়ে যায়। কেউ তাদের মনে রাখে, কেউ রাখেনা। এরকম অনেক মানুষের একজন রমা (পদবি উহ্যই থাক)। সবাই ওই নামেই ডাকত। আমিও তাই ডাকতাম।

অথচ আমার থেকে অনেক বড় ছিল বয়সে। কিন্তু হলে কি হবে, তখন ওকে নাম ধরে ডাকাটাই আমার অভ্যাস ছিল। শুধু তাই নয়, সবার মতো আমিও তাকে তুই তোকারি করেই কথা বলতাম। এগুলো যেন মনিব বাড়ির ছেলে হওয়ার সুবাদে আমার অধিকারের মধ্যেই ছিল। এখন ভেবে আশ্চর্য লাগে, কেউ কি কোনোদিন আমাকে বলে দেয়নি যে ও আমার থেকে অনেক বড়, ওকে নাম ধরে ডাকতে নেই, তুই বলতে নেই? নাকি বললেও আমিই শুনিনি সে বারণ? বলা বাহুল্য, সেও কোনোদিন বলেনি আমায়।

আমার বাড়িতে চাষবাস থাকার সুবাদে ছোটবেলার অনেকটাই কেটেছে মাঠেঘাটে, আর রমার সঙ্গেও কাটত বেশ কিছুটা সময়। রমা একজন অন্ত্যজ শ্রেণীর দরিদ্র মানুষ। আসলে ও ছিল আমাদের বাড়ির স্থায়ী মুনিষ। বলা ভালো, খেতমজুর। আমি জ্ঞান হওয়া থেকে তাকে দেখেছি সেই ভূমিকায়। যখন যেমন পারিশ্রমিক আর সবাই পেত, সেও পেত তেমনি। বেশির ভাগটাই হিসাব মতো ধান নিয়ে নিত। মাঝে মাঝে দরকার হলে কিছু টাকা। অগ্রিম কিছু ধান দেওয়াই থাকত তাকে সারা বছরের জন্য। ওর জন্য নির্দিষ্ট ছিল সামান্য পরিমাণ জমিও। আমাদেরই গরু লাঙ্গল নিয়ে, আমাদেরই বীজ নিয়ে সেখানে ও চাষ করত। যা ধান হত, পুরোটাই ওর। আমাদেরই খামারের এক কোণে সেগুলো তুলত। এটাই সিস্টেম ছিল তখন। তাছাড়াও বিভিন্ন সময় নানান পরবে বা অনুষ্ঠান উপলক্ষে উপরি পাওনা কিছু হতোই।

বলতে গেলে সে ছিল পরিবারেরই একজন আর চাষবাসের পুরো দায়িত্বই ছিল তার উপর। কোথায় শুরু করে কোথায় শেষ হবে, চাষের সময় ধান কাটার সময় কোন দিন কোথায় কতজন এক্সট্রা খেতমজুর লাগবে, এসব ঠিক করা হত তার সঙ্গে পরামর্শ করেই। ওর মতামত ছাড়া চাষের কোনও কাজ হতনা।

এগুলো নতুন কিছু নয়। তখনকার প্রথা অনুযায়ী শুধু উচ্চবর্ণের নয়, যাদেরই কিছু জমিজমা আর চাষবাস আছে সেরকম প্রায় সব পরিবারেই এরকম একজন কেউ থাকত। তার সঙ্গে পারস্পরিক ভরসা আর বিশ্বাসের জায়গাটা খুব মজবুত থাকত। মানুষের সঙ্গে সম্পর্কের বন্ধনটাই আসলে ছিল এরকম। আমি অন্তত জ্ঞান হওয়া থেকে সেরকম দেখেছি। সেই অবস্থান থেকেই রমার মধ্যে যে গুণটা সবচেয়ে বেশি নজর কাড়ত তা হল ওর সারল্য আর মায়া। নিরঙ্কুশ সততার সঙ্গে এই গুণগুলো একসঙ্গে খুব কম জনের মধ্যেই পাওয়া যায়।

তাই বলে কি ও ধর্মভীরু ছিলনা? ছিলই তো। শৈশব কৈশোরে বারেবারেই ওর সেই পরিচয় পেয়েছি। মাঠ থেকে ফিরে বিকেলে সে উঠোনের একপাশে এসে এক হাতের তালুর উপর আর একটি হাত পেতে দাঁড়াত। তার মানে তখন তার বাইরের সমস্ত কাজ সারা হয়ে গেছে। তখন ঠাকুমা বা কাকিমা যার চোখে পড়ত সেই তখন তেলের ভাঁড় নিয়ে এসে তার হাতে তেল ঢেলে দিত। রমা তেলের বেশির ভাগটা মাথায় মেখে নিত, বাকিটা গায়ে এদিক ওদিক বুলিয়ে নিতে নিতে চলে যেত পুকুরের দিকে। বলা বাহুল্য সেটা সরষের তেল। তখন আমিও মাথায় সরষের তেল মাখতাম। এখনও অনেকে মাখে। তবে স্নান করে আসার পরও রমার মাথাটা বেশ তেল চুকচুকে লাগতো। তখন সে খেতে বসত উঠোনের এককোণে। ওর খাওয়ার জন্য একটা আলাদা জামবাটি ছিল। যেদিন একটু বেশি দেরি হয়ে যেত সেদিন রমা তার খাবার নিয়ে বাড়ি চলে যেত।

একদিন সেইরকম স্নান করে এসে ও খেতে বসেছে। ওর চারদিকে ঘোরাঘুরি করতে করতে একসময় ওর খাবারের দিকে তাকিয়ে আমি বললাম, আমাকে একটা আমসি দিবি? সময়টা সম্ভবত বর্ষার শেষের দিকে বা শরৎকাল হবে। সেই সময়টায় মাঝে মাঝেই বাড়িতে করে রাখা আমসির টক হতো।

ওর খাওয়া দেখে হয়তো আমার লোভ লেগেছিল। তাই চেয়েছিলাম। রমা আমার দিকে তাকিয়ে বলেছিল, ‘যা পালা। বামুনের ছেলেকে এঁটো খাইয়ে আমি মরি আর কি’! আমি জেদ করেছিলাম। ব্যাপারটা লক্ষ্য করেছিল কাকাবাবু। বলেছিল দে দে রমা। কিচ্ছু হবেনা, ওর এখনও পৈতে হয়নি। তারপর কাকিমাকে বলেছিল, ওকে আর একটু আমসির টক দিয়ে দাও তো।

ওর খাওয়া দেখতে এতো ভালো লাগত! যথেষ্ট খাটাখাটনির পর একপেট খিদে নিয়ে বড় বড় গ্রাস তুলে যে খাওয়া আর তা থেকে তার চোখে মুখে যে তৃপ্তি সেটা আমি সেই ছোটবেলাতেই বুঝতে পারতাম। খুব ভালো লাগত ওর তৃপ্তি দেখে। বড়বেলাতেও সেই একইরকম দেখেছি। ওরকম খিদে নিয়ে যদি খেতে পারতাম!

চাষের সময় যখন জমিতে লাঙ্গল দিত, কত করে বলতাম, আমাকে একবার লাঙ্গল ধরতে দে। ও কিছুতেই লাঙ্গলের বোঁটায় হাত দিতে দিতনা। বলত, ‘বামুনের ছেলে, হাল ধরতে নাই। পাপ হবেক’। আমি অবাক হতাম। বামুন বলে লাঙ্গল ধরতে নেই এ আবার কি? বলতাম, আমার পাপ হবে, তোর কি? ও বলত, ‘আমি যদি তোকে লাঙ্গল ধরতে দি, তাহলে আমারই পাপ হবেক’। আমি সুযোগ খুঁজতাম। ও যখন বিশ্রাম নিতে যেত, আমি লাঙ্গলের বোঁটা টা ধরে গরুগুলোকে চালাতে চাইতাম। গরুগুলোও তেমনি। বোধ হয় বুঝতে পারত আমি রমা নই। তুচ্ছ এবং নিরীহ কেউ। নিতান্ত অনিচ্ছায় দু পা এগিয়ে থেমে যেত। ওইটুকুতেই বুঝতে পারতাম মাটির মধ্যে লাঙ্গলের ফাল চেপে ধরে এগিয়ে যাওয়া কি কঠিন!

লাঙ্গল ধরতে না দিলেও ও যখন জমিতে মই দিত, আমি কিছুতেই ছাড়তামনা। পিছন থেকে গিয়ে ওর দুপায়ের ফাঁকে বসে পড়তাম। দুপাশের দড়ি ধরে থাকতাম। কখনও ওর পা দুটোই হাত দিয়ে শক্ত করে ধরতাম। ও তখন কি করবে বুঝে উঠতে পারতনা। গরুতে যথারীতি মই টানছে। আমি যদি বেসামাল হয়ে সামনের দিকে পড়ে যাই সে আর এক বিপদ। অথচ ওর পায়ের ফাঁকে ওর হাঁটুগুলো ধরে বসে আছি মইয়ের উপর, সেই অস্বস্তিও মেনে নিতে পারছেনা।

কিছুক্ষণ পর জোর করে মই থেকে নামিয়ে দিত, ওর পা ধরে বসেছি বলে প্রণাম করতে আসত। আমি পিছনদিকে ছুট লাগাতাম। বলতাম, বড়রা আবার ছোটদের প্রণাম করে নাকি? রমা চিৎকার করে ডাকত। বলত, ‘ওরে থাম থাম, পণাম করতে দে। তুই বামুন। তুলসী পাতার ছোট বড় নাই।’

রমার তো অভাব কম ছিলনা! আমাদের কাছ থেকে আর কতটুকু মিটত! কিন্তু তবুও সে এত নির্লোভ, কোনোকিছুর ব্যাপারে এত আসক্তিহীন যে ভাবলে আজও অবাক হই। জমিতে ফলন ভালো হলে ও আনন্দে টগবগ করে, খারাপ হলে মনে কষ্ট হয়। যেন লাভ বা ক্ষতি সব ওরই। আসলে ও যে ওতপ্রোত ভাবে জড়িত সবকিছুর সঙ্গে! জমিটা ঘটনাসূত্রে আমাদের হতে পারে, কিন্তু জমির উপর ওর মায়াটা অকৃত্রিম। কাজটা ছিল ওর কাছে ভালোবাসা।

রমা আমাকেও বেচাল দেখলে শাসন করতে ছাড়তনা। মাঠে যখন আলু উঠত, আমি গিয়ে বায়না ধরতাম আলু পুড়িয়ে খাবো। মাটির মধ্যে একটু গর্ত মতো করে শুকনো পাতা কাঠি ইত্যাদি দিয়ে সদ্য তোলা আলু পুড়িয়ে খাওয়ার যে স্বাদ, যে খেয়েছে সেই জানে। রমা ওসব করতে দিতনা। বলত, ‘যত সব লক্ষ্মীছাড়া স্বভাব। জমিতে ওসব করতে নাই। ঘরে যেয়ে খাবি’।

উৎসবের সময় আবার তার অন্য মেজাজ। গাজনতলা যাওয়ার সময় তাকে বেশি করে পাওয়া যেত সেই মেজাজে। চৈত্রের গাজনে আমাদের গ্রামে চড়কের মেলা হয়, কিন্তু গাজনের বড় মেলাটি হয় পাশের গ্রামে। দিন দশেক থাকে সে মেলা। মা কাকিমা ঠাকুমা পিসিমারা সবাই মিলে একদিন অন্তত মেলায় যেতই। তখন যাওয়া হত গরুর গাড়িতে করে আর গাড়ি চালিয়ে নিয়ে যেত রমা। যে অন্য সময় গরুর লেজে আলতো মোচড় দিয়ে লাঙ্গল চালায়, সে গাজনতলা যাওয়ার সময় ফিটফাট হয়ে সেই গরুকে অন্যভাবে চালনা করে। আগে থেকে গরুর গা ধুইয়ে শিংযে তেল মাখিয়ে রাখে, গলায় ঘণ্টা পরিয়ে দেয়। যেতে যেতে ঝুমঝুম করে সেগুলি বাজতে থাকে। তার হাতের ইশারায় গাড়ি যেন আপনিই চলতে থাকে। সেই জার্নিটা যে কি উপভোগ্য হতো!

আর পুজোর সময়? তখন তো সারা প্রকৃতি জুড়ে একটা খুশি খুশি ভাব। আকাশে হাসির ছটা। চারদিকে ঘন সবুজ। মাঠের ধান সবুজ। শুধু আউস ধানগুলি পেকে এসেছে। তাদের রঙ সোনালি। খুব শিগগির ঘরে নতুন চালের ভাতের গন্ধ ছড়াবে। সেইটা খুশির একটা বড় কারণ। আর তার বৌএর জন্য যে নতুন শাড়িটি পাওনা হত, তাতেই মুখে চোখে আনন্দের ফুল ফুটত। কত অল্পতে যে খুশি হত রমা!

খুব ছোটবেলায় ওর কাঁধে চেপে গেছি বহু জায়গায় বহুবার। কেমন যেন আপনজন ছিল আমাদের। দারিদ্র নিত্যসঙ্গী, তবু জীবনে কোনোদিন কোনও দাবি নেই, কোনও আবদার নেই, কিচ্ছু চাহিদা নেই, এমন উদাসীন হাসিখুশি মানুষ বেশি দেখিনি। কোনও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার তো প্রশ্নই নেই, অক্ষর জ্ঞানও ছিলনা ওর। তবু জীবনের পাঠশালায় তার কাছ থেকে যা শিখেছি, তাতে রমাকে আমার একজন গুরুর আসনে বসাতে একটুও ভাবতে হয়নি।

Leave a Reply

Your email address will not be published.