সলিল চৌধুরী: এ মহাপৃথিবীর চরাচর

দেবজ্যোতি মিশ্র 

‘ওগো অহল্যা আমার 
কোথায় বসাবো বলো তুমি ফিরে এলে
আমার কুটিরে আর জ্বলে নাকো আলো
ভাঙা ছাদ টলোমলো, বৃষ্টি এসে পড়ে’ 

সেদিন বৃষ্টি হয়নি কিংবা ছেঁড়া ছেঁড়া মেঘে বৃষ্টির কথা লিখে রাখেনি কেউ। শূন্য আকাশ তাকিয়ে ছিল হ্যাঁ করে। গ্রাম নগর মাঠ পাথার বন্দর কারো ঘরে জ্বলেনি দীপ। শুধু সমুদ্রের মতো ক্রোধ আছড়ে পড়তে চায়। মনে হয় এবার চোখের সামনে ভেঙে পড়বে বাস্তিলের দূর্গ। তারপর একটা ময়ূর, সে ছড়িয়ে দেবে নতুন দিনের রং। যেভাবে প্রজাপতি একদিন গুটিপোকা হয়েছিল ঠিক সেই ভাবে এই পৃথিবীর আলো বাতাসের অধিকার ওরা ছিনিয়ে নেবে। 

সলিলদা ডাকলেন দেবু, আমি যেন একটা ঘোরের মধ্যে থেকে রক্ত মাংসের পৃথিবীতে ফিরে এলাম। 
দুর্গাপুরে একটা জলসা। আমরা সবে মাত্র গিয়ে পৌঁছেছি। আমাদের আগে পরে বেশ কিছু শিল্পী অনুষ্ঠান করবেন। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় কিছু আগেই পৌঁছে গেছিলেন, সলিলদার সঙ্গে দেখা হতেই সাধারণভাবে উঠে দাঁড়ালেন সৌমিত্রদা। তারপর তাদের মধ্যে অনেক কথা। আমি মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে শুনছিলাম দুই মহান শিল্পীর পারস্পরিক আদান প্রদান। যাইহোক সে সময়ের সৌমিত্রকাকু এখন দাদা হয়ে গিয়েছেন কারণ একই পেশায় বহু বছর কাজ করলে যা হয় শুধুমাত্র ছেলের সম্পর্কে অর্থাৎ সৌগতর সম্পর্কে কাকু বলা শ্রেয় নয়, সৌমিত্রদাই তাই যথাযথ। সলিলদা পরপর কয়েকটা গান মনে করিয়ে দিতে থাকলেন, যে গানগুলো আমরা স্টেজে গাইবো। যেমন ‘ঢেউ উঠছে কারা টুটছে’, ‘আমার প্রতিবাদের ভাষা’ এই করতে করতে একসময় সৌমিত্রবাবু বললেন আমি কিন্তু আজ আপনার ‘শপথ’ পড়ছি। সলিলদা ঈষৎ হাসলেন, তাহলে চলো না দুজনে একসঙ্গে পড়ি। সে এক ইতিহাস, স্টেজে সৌমিত্রদা শপথ কবিতা পড়ছেন সঙ্গে সলিল চৌধুরী। যদিও সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের অনুষ্ঠান হওয়ার কথা বেশ কিছুক্ষন পরে তবুও শপথ কবিতাটি নিয়ে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় জয়েন করলেন আমাদের সঙ্গে। একটা জায়গায় গিয়ে সৌমিত্রবাবু থেমে গেলেন, সলিলদা পড়ে যেতে থাকলেন
‘পাষাণী অহল্যা ওগো যত রাজপথ কান পেতে কি আমার আগমনী শোনো’।

সেই দুর্গাপুরের জলসায় সেদিন উপস্থিত ছিলেন দ্বিজেন মুখোপাধ্যায়। আমাদের বেশ কিছু পরে শো ছিল ঊষা উত্থুপেরও। সলিলদা সৌমিত্রদার যুগলবন্দীতে শপথ কবিতাটির প্রতিটি শব্দ এমন একটি চূড়ান্ত জায়গায় পৌঁছে গেছিল যেন মনে হল সমস্ত মানুষ গ্রাম নগর মাঠ পাথার বন্দর থেকে নেমে এসেছে দুর্গাপুরের মাটিতে। অনুষ্ঠান শেষ হল তখন বেশ রাত। আমরা বেরিয়ে পড়লাম। এরপর গাড়িতে ফিরছি সলিলদা বললেন সৌমিত্র কি অসাধারণ পড়ে নারে…আমি বললাম আপনার মত না। সলিলদা গাড়ির জানলা দিয়ে বাইরে তাকালেন। কি যে বলিস ওর পাঠ মানুষের কতো ভালো লাগে জানিস! এই পাঠ করার জন্যই তো ও এসেছে আর আমি তো গান করি আজ সৌমিত্র পড়লো বলে ওকে কম্পানি দিলাম। আমি বললাম আপনি পড়লে আমার মধ্যে একটা আলাদা অনুভূতি জাগে। সলিলদা হাসলেন আমি একটু ওল্ড স্কুল কিনা তাই হয়তো তোর ভালো লাগে। আসলে আমাদের সময়টাই ছিল অন্যরকম।  যে সময় দাঁড়িয়ে প্রতিটা প্রতিবাদের মধ্যেই একটা ম্যাসকুলিনিটি ছিল। সেটার সাথে জেন্ডারের কোনও সম্পর্ক নেই। এই ধর যখন তৃপ্তিদি নাটক করতেন, সুচিত্রা যখন গাইতো তার মধ্যেও একটা ম্যাসকুলিনিটি তৈরি হতো। পঞ্চাশের দশক, উত্তাল সময় তার মধ্যেই সেই আহল্যা সেই কাকদ্বীপ। জানিস কতদিন ঘুমাতে পারিনি। এখনও চোখ বন্ধ করলে সেই দিনগুলো দেখতে পাই। হয়তো আমার ছায়ায় জড়িয়ে আছে। এখন তো এই শহর জীবনের সঙ্গে জুড়ে গেছি। হয়তো অতীতকে ফেলে এসেছি কিন্তু এখনো কোথাও গিয়ে মনে হয় যদি আহল্যা থাকতো, আমার সামনে এসে দাঁড়াতো আমি কি মাথা তুলে দাঁড়াতে পারতাম! আমাদের কত প্রতিশ্রুতি ছিল। স্বপ্ন দেখতাম একদিন আমরা স্বাধীন হবো বিপ্লবে। আহল্যা মাকে যে অসম্মান যে নিষ্ঠুর ভাবে মারা হয়েছিল আমরা তার শোধ নেবো। সেটাই তো ছিল শপথ কবিতা। সেই শপথ কবিতা থেকে আমরা  অনেক দূরে চলে এসেছি। এই জলসায় কথাই ধর, আজকে এত মানুষ কবিতাটা শুনছে। আমি তো বারবার কবিতার জন্ম লগ্নে ফিরে যাই, সেই মুহূর্ত অহল্যাকে যখন বেয়নেট দিয়ে মারা হলো। আমি স্পষ্ট দেখি ‘প্রজাপতি যতো আরও একদিন গুটিপোকা হয়েছিল, সেদিন রাত্রে সারা কাকদ্বীপে হরতাল হয়েছিল।’ 

আসলে আমাদের স্বপ্নের মধ্যে সবাই ছিলাম আমরা। সমরেশের সঙ্গে কথা হচ্ছিল সেদিন। সমরেশ বলল আমরা স্বপ্ন দেখতাম পরদিন সকালবেলা ঘুম ভেঙে উঠে দেখবো বিপ্লব দাঁড়িয়ে আছে মোড়ের মাথায়। সে বিপ্লব আজও আসেনি। কিন্তু তবুও এই জলসাতে মানুষ যখন শপথ কবিতাটি শোনে আমার মনে হয় কোথাও এর একটা সার্থকতা আছে। গ্রাম পেরিয়ে গাড়িটা খুব দ্রুত গতিতে চলছে। গাড়ির আওয়াজ অনেকটা ঝড়ের আওয়াজের মতো। এ যেন তোলপাড় করা ঝড় যা নিয়ত চলতে থাকে বাইরে থেকে ভিতরে। বেশ কিছুক্ষণ সলিলদা চুপ। একটা সাপের মতো রাস্তা অতীত থেকে ভবিষ্যতে ঢুকে যাচ্ছে। সলিলদা বললেন জানিস কাকদ্বীপ জুড়ে কতো মানুষ গৃহহীন। সে সময় রিলিফের কাজে বেরোতাম। বন্যায় সমস্ত ঘর ভেসে গেছে। সেখানে খাদ্য পৌঁছে দিতে হবে। এখনও দূর থেকে ভেসে আসে সেইসব মানুষের ডাক। সে ডাক শুনলে হয়তো আমার এই নাগরিক জীবন, এই বেঁচে থাকার সঙ্গে ক্ল্যাশ বেধে যাবে। তাই দূরে দূরেই থাকি। কিন্তু যখন এইসব কবিতার অক্ষরেরা উঠে আসে এক অদ্ভুত মায়া হয়। কারোর প্রতি নয় নিজের প্রতি। নিজেদের প্রতি। আমাদের কমিউনিস্ট পার্টি মুভমেন্টটা কমপ্লিটলি ফেল করল। আজ মনে হয় সমস্তটাই নেতাদের জন্য হয়েছে। আমাদের নেতৃত্ব ছিল না। লেনিনের মতো নেতৃত্ব না হলে একটা বলসেভিক মুভমেন্ট হয় না। আমরা পি সি যোসির নেতৃত্বে ছিলাম, একটা সময় পর্যন্ত সব ঠিক ছিল তারপর ভেঙে চুরে চৌচির হয়ে গেছিল স্বপ্ন। জানিস ঋত্বিক চেয়েছিল এই শপথ কবিতাটা নিয়ে একটা ছবি করবে। এই কাকদ্বীপ এই আহল্যা। সেসব কিছুই হয়নি। কারোরই স্বপ্ন পুরো হয়নি। সে স্বপ্নগুলো কতো গভীর ছিল কতো গভীর সে মর্মবেদনা। একটা সিগারেট ধরালেন সলিলদা আরও খানিকটা পথ। আসলে পার্টি বুঝতেই পারেনি। পুুরোটাই একটা একগুঁয়ে ব্যাপার। বিপ্লব জোর করে মানুষের ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়া যায় না। ডিক্টেটরশিপ দিয়ে কি বিপ্লব হয়! আমাদের পার্টির কোনও যোগ্য নেতৃত্ব ছিল না। ওরা মনে করত এই গাননাট্য এই নাটক ফাটক এ সবই বহিরঙ্গের আভরণ। বুঝলাম সলিলদা ভীষণ বিরক্তি থেকে কথাগুলো বললেন। আমরা গান টান করি, মিছিলে যাই। আসলে কাজটা তো শুধুমাত্র মিছিলে লোক জড়ো করা। এর বাইরে পার্টি কোনদিনই কোনও গুরুত্ব দেয়নি। 

আজকে সৌমিত্রর সাথে কথা হচ্ছিল। ওরা তো অনেক পরে এসেছে। মানিকবাবুর সাথে ও বেশ অনেকগুলো কাজ করেছে। আমি খুশি। বুঝলি আজ আমার প্রতিবাদের ভাষা গানটা যখন গাইলাম তখন মনে হলো সত্যিকারের প্রতিবাদটা কোথাও গিয়ে নেভেনি তো! কিন্তু আমি এটাও জানি দেবু আমি ভেঙে চুরে তছনছ হয়ে যেতে পারি কিন্তু আমার প্রতিবাদের ভাষা পৃথিবীর যে কোনও প্রান্তরে ঠিক একদিন মানুষের প্রতিবাদের ভাষা হয়ে উঠবে। হতে পারে স্প্যানিশ ভাষায় হতে পারে ফরাসিতে কিংবা কিউবায়। আমার দৃঢ় বিশ্বাস আমার প্রতিবাদের ভাষা আমার প্রতিরোধের আগুন ঠিক পৃথিবীর যে কোনও প্রান্তে অন্য আরেকটা মানুষের কন্ঠ হয়ে উঠবে। এই কনভিকশনটা আজও বেঁচে আছে নাহলে আমিও থাকতাম না। 

এরপর ভোর ভোর যখন কলকাতা পৌঁছোচ্ছি সলিলদা ঘুমিয়ে পড়েছেন আমিও আধো ঘুমে। আমার মাথার ভিতর একটা ঘোর চলছে, সাদা কালো ছবির মতো। আমি দেখতে পেলাম হাজার হাজার কৃষি মানুষ আগুন জ্বালিয়ে এগিয়ে আসছে। মহিলারা আসছে শিশুরা আসছে আর তাদের নেতৃত্ব দিচ্ছে আহল্যা। হঠাৎ কোথা থেকে ছুটে এল ডাকিনী যোগিনী এলো নাগিনা নাগিনী এলো পিশাচেরা। এলোমেলো টুকরো জ্যামিতি টুকরো টুকরো সময়ের কাচগুলো ভেঙে পড়তে থাকলো। হঠাৎ কিছুটা রক্ত ছিটকে উঠলো। আহল্যা যেন গড়িয়ে পড়ল মাটির গায়ে। তারপর মাটির সাথে আস্তে আস্তে মিশে যেতে লাগলো। কি ভীষণ সে আগুন। জ্বলে ছাই হয়ে গেল আহল্যার দেহ। বহু বহু মানুষ নত মুখে দাঁড়িয়ে আছে ‘পাষাণী আহল্যা ওগো যত রাজপথ/ কান পেতে কি আমার আগমনী শোনো’। মনে হলো সলিলদার কণ্ঠে যেন ভেসে যাচ্ছে এ মহাপৃথিবীর চরাচর…

Leave a Reply

Your email address will not be published.