সমুদ্র অথবা অবলম্বন

কুবলয় বসু 

দুপুরে এখন বাড়িতেই খেতে আসে মাধব। আগে দোকানেই খেয়ে নিত বাড়ি থেকে আনা সকালের তৈরি রুটি-তরকারি। খেয়ে গল্প-গুজব করতে করতে দোকানেই একটু ঘুমিয়ে নিত তারা দু’তিন জন কর্মচারী। সবাই থাকত বলে মাধবও আর বাড়ি ফিরত না। দুপুরে মালিক দোকান বন্ধ রাখে। সেই সময়টা বিশ্রাম পাওয়া যেত। আবার বিকেল পাঁচটায় খুলত। এখন সকালে ধীরেসুস্থে বেরোতে পারে, রান্নার চাপটা নেই বলে। দুপুরে দু’টোর সময় দোকান বন্ধ হলে দশ মিনিটের রাস্তা হেঁটে ছকু খানসামা লেনের এক কামরার ঘরে ফিরে আসে। স্নান সেরে খেতে বসে সে আর তার বৌ মিনতি। 

বিয়েটা আচমকাই করে ফেলেছিল মাধব। মিনতি সপ্তাহে দু’দিন দোকানে আসত সওদা বাজার নিয়ে যেতে। সে কাজ করে রমাকান্ত মিস্ত্রি লেনে মজুমদার বাড়িতে। আগে চব্বিশ ঘণ্টাই ও বাড়িতে থাকতে হত। এখন বিয়ের পর খুব ভোরে বেরিয়ে চলে যায়, বারোটার মধ্যে ফিরে আসে। রান্নাবান্না, সংসারের কাজ ঝটপট সেরে অপেক্ষা করে মাধবের ফেরার। আবার মাধবের সঙ্গেই বিকেলে বেরোয়, ফেরে রাত দশটায়। মাধব ফেরে আরো এক ঘণ্টা পরে।  

পূরবী সিনেমার পাশেই যে বড় মুদিখানার দোকান, সেই দোকানে মাধব ফর্দ মিলিয়ে মাল গুছিয়ে দেবার কাজ করে। তার বাবা তাকে এই কাজে ঢুকিয়ে দিয়েছিল। দোকান মালিকের হরেক কিসিমের বিজনেস আছে। তার বাবা কাজ করত মালিকের তেলকলে। মা তার ছোটবেলাতেই নানা রোগে ভুগে মারা যায়। বাবা-ই তার সব।  মালিককে বলে এই দোকানে বাবা তাকে বহাল করে দিয়েছিল। সাঁইত্রিশ বছর বয়েসেও মন দিয়ে সে এই কাজই করে চলেছে। তার কাজের সুনাম রয়েছে। এই দোকানে যতজন জিনিস কিনতে আসে মাসকাবারি বা পাইকারি, মাধবের হাতেই সবাই ফর্দ দিতে চায়। কারণ, মাধব খুব দ্রুত লিস্ট মিলিয়ে থলিতে বা ব্যাগে জিনিস গুছিয়ে দিয়ে দিতে পারে। খদ্দেরকে বেশিক্ষণ দাঁড়াতেও হয় না। বাবার আমলের মালিকের যথেষ্ট বয়েস হয়েছে, তিনি আর দোকানে আসতে পারেন না। এখন দোকানে বসে তাঁর ছেলে। সেও জানে মাধবের পাকা হাতের কাজের নমুনা। উপরন্তু একদিনও বাড়তি ছুটি নেয়না মাধব, কোনো বাজে আবদারও কখনো করেনি মালিকের কাছে। তাই বছর বছর মাধবের মাইনে বাড়তে কোনো সমস্যাও হয়নি।

কিন্তু মিনতিকে দেখার পর থেকে মাধবের মন দুর্বল হয়ে উঠল। যদিও কাজে তার প্রভাব পড়তে দেয়নি সে। শুধু অপেক্ষা করত সপ্তাহে দু’টো দিন মিনতির দোকানে আসার। একজন সঙ্গীর অভাব সে বারেবারে টের পেত। দু’টো কথা বলার, একটু পরামর্শ করার মতো একজন মানুষ। সাপ্তাহিক ছুটির দিনে একটু ঘুরতে যাওয়া, একটু গল্প করতে করতে ভালোমন্দ রান্না-খাওয়া, সব কিছুর জন্য পাশে একজন কাউকে পেতে খুব ইচ্ছা হত মাধবের। শরীরের ইচ্ছা তো আছেই। মিনতিকে দেখার পর থেকে মাধবের সেই ইচ্ছাগুলো মনের মধ্যে আরো বেশি করে জেগে উঠতে শুরু করেছিল। 

ছেলেদের চোখের ভাষা পড়তে কোনো মেয়েরই আজ অবধি কোনো অসুবিধা হয়নি। মিনতিও তার ব্যতিক্রম নয়। মাস আষ্টেক এইভাবে কাটার পর একদিন মিনতি যখন সওদা নিয়ে দোকান থেকে বেরোচ্ছে, মালিকের ছেলেকে বলে মাধবও বেরোল। কিছুটা রাস্তা পা চালিয়ে এগিয়ে এসে মিনতিকে আটকাল। মিনতির মনের মধ্যে কোথাও একটা ধারণা ছিলই যে এরকম কিছু একটা যে কোনো দিন হতেই পারে। মাধব সাদাসিধা মানুষ। ইনিয়েবিনিয়ে কিছু বলার অভ্যাস তার ছিল না। সরাসরি মিনতিকে সে বিয়ের প্রস্তাব দেয়। বেলা বারোটায় এক রাস্তা লোকজন, গাড়িঘোড়ার মাঝে বিয়ের প্রস্তাব পেয়ে মিনতি একটু বেসামাল হয়ে গিয়েছিল, কিন্তু সামলেও নিয়েছিল। তারও নিজের বলতে কেউ নেই। সে ছোটো ইস্তক পিসির কাছে মানুষ। বড় হয়ে পিসির মুখেই শুনেছে যে, তার বাবা মদ খেয়ে এসে মা’কে রোজ মারধোর করত, একদিন সেই মারের চোটেই মা মরে যায়। বাবার জেল হয়েছিল। সেই তিন বছর বয়েস থেকেই সে পিসির কাছে। জেলে সাজার মেয়াদ শেষ হবার পর বাবার আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। পিসি মজুমদার বাড়িতে নাইটি বিক্রি করতে আসত। ফলস পাড় বসানো, পিকো করার কাজও করত। সেই রোজগার থেকেই তাকে পিসি মাধ্যমিক পাশ করিয়েছিল। তারপর মজুমদার বাড়ির গিন্নিমা-কে পিসি মিনতির কথা বলে। সেই থেকে মিনতি এই বাড়িতে রয়ে গেছে। বাড়ির একজন সদস্য হিসেবেই সবাই তাকে দ্যাখে, কাজের লোক হিসেবে নয়। পিসি মারা গেছে বছর পাঁচেক হল। মজুমদার গিন্নিও আর নেই। বাড়ির কর্তা তো তারও অনেক আগেই চলে গেছেন। বাড়ির একমাত্র ছেলে সুমন্ত আর তার বৌ সর্বাণী অনেকবার মিনতিকে বলেছে বিয়ে করে নেবার জন্য। এমনকি পাত্র তারাই খুঁজে দেবে এও বলেছে, মিনতি রাজি হয়নি। কিন্তু তাদের কথা শুনতে শুনতে তার মনের মধ্যেও হয়তো কোথাও একটা বিয়ের ইচ্ছা, সংসার করার ইচ্ছা জমা হচ্ছিল। আজ এই তিরিশ বছর বয়েসে এসে মাধবের বিয়ের প্রস্তাবে তাই সে আর না করেনি।   

খেতে বসে মিনতি কথাটা তুলল। এবার পুজোয় ও বাড়ির দাদা-বৌদি নাকি সমুদ্র দেখতে তায়ল্যান না কোথায় যেন যাচ্ছে। বিয়ের পর তারা নিজেরা কোথাও বেড়াতে যায়নি। ওদের কথা শুনে তারও মনে হচ্ছিল কোথাও ঘুরতে গেলে বেশ হতো। মাধব তো ছুটিই নেয় না। বিয়ের জন্য সাকুল্যে দু’দিন ছুটি নিয়েছিল। মালিকের ছেলেকে বললে হয়তো আরো দু’চারদিন ছুটি ঠিক দিয়ে দেবে। মিনতির সমুদ্র দেখার ইচ্ছা অনেক দিনের। পিসির সঙ্গে খুব ছোটবেলায় একবার পুরী গিয়েছিল। পাড়া থেকে অনেকে মিলে বাসে করে যাওয়া হয়েছিল চার দিনের জন্য। সব কিছু ভালো মনে নেই তার। শুধু ওই বিরাট জলোচ্ছ্বাস, গর্জন অল্প অল্প মনে পড়ে। আবার সমুদ্রের ধারে যাবার ইচ্ছাটা দীর্ঘদিন ধরেই মনে পুষে রেখেছে মিনতি।

কথাটা মাধবেরও মনে ধরল। দোকানেও সবাই বলছিল যে কোথাও ঘুরে এলে না! তবে মিনতির ‘তায়ল্যান’ শুনে মাধব একচোট হাসল। মিনতিকে বলল-“ওটা থাইল্যাণ্ড। সে তো বিদেশ। আমার কি আর অতো পয়সা আছে!” মিনতি সব শুনে বলল- “ও বাড়ির দাদা বলছিল খুব নাকি কম খরচ! একবার খোঁজ নিয়েই এসো না। আমারও জমানো কিছু টাকা আছে, ও ঠিক হয়ে যাবে।” মিনতির চোখেমুখে উত্তেজনার ছাপ দেখে মায়া হয় মাধবের। আহা, কাজ করতে করতেই দিন গেছে মেয়েটার, কোথাও বেড়াতে যেতে পারেনি। সমুদ্র দেখবে বলে কতো আশা করে আছে। এটুকু পারবে না মাধব বৌয়ের জন্য! দোকানে রোজ খবরের কাগজ নেওয়া হয়, মাধব সকালে গিয়ে একবার চোখ বুলিয়ে নেয়। কয়েকদিন আগেই কাগজের সঙ্গে বিজ্ঞাপনের একটা পাতা দিয়েছিল, তাতে মাধব দেখেছিল ধর্মতলার ওদিকে একটা স্টেডিয়ামে বেড়াতে যাবার সুলুকসন্ধান দেবার জন্য কী যেন একটা হচ্ছে। পর্যটন মেলা না কী যেন! একবার মিনতিকে নিয়ে গেলে হতো। বৃহস্পতিবার করে তো তার নিজের ছুটি থাকেই। দুপুর দুপুর গিয়ে খোঁজখবর করে আসাই যায়। পরে আর আদৌ সুযোগ হবে কিনা কোথাও বেড়াতে যাবার, এইবেলা ঘুরে আসাই ভালো। থাইল্যাণ্ডে যাবার কম খরচের কথা শুনে মাধবের মনেও বিদেশে বেড়াতে যাবার আশা অল্প হলেও জেগেছে, মিনতির যাবার ইচ্ছা শুনে আরোই সে স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছে সেখানে যাবার।

বিয়ের পর সেভাবে একসঙ্গে কোথাও বেরনো হয়নি, তাই মাধবের সঙ্গে বেরনোর জন্য মিনতি সবচেয়ে ভালো শাড়িটা বের করলো। বিয়েতে ও বাড়ির বৌদির দেওয়া। মাধবকেও একটা ভালো জামা বের করে দিলো। নয়তো এসব দিকে মাধবের তেমন মন নেই। মিনতি সেজেগুজে তৈরি হতেই মাধব মুগ্ধ হয়ে গেল। জীবনে আনন্দ পাবার, সকাল থেকে রাত অবধি মেহনত করে বাড়ি ফেরার কারণ যেন এখন শুধু মিনতিই। 

একটা বাসেই স্টেডিয়ামের ওখানে পৌঁছে যাওয়া যায়। স্টেডিয়ামে ঢুকে দু’জনেই বেশ চমকে গেল। কত রকমের লোকজন। চারিদিকে কত দারুণ দারুণ জায়গার ছবি। মাধব আর মিনতি দু’জনেই মোটামুটি ইংরেজি পড়তে পারে। একটু এগোতেই থাইল্যান্ড নামটার উপর দু’জনেরই চোখ আটকে গেল। থাইল্যান্ডের স্টলে গিয়ে পৌঁছতেই সেখানে আগে থেকেই দাঁড়িয়ে থাকা একজন ভদ্রলোক আর ভদ্রমহিলা মাধবদের দেখে একটু সরে গেলেন। ভদ্রমহিলা ইংরেজিতে কী বললেন ভদ্রলোককে মাধব ভালো বুঝতে পারল না। তবে সেটা যে তাদের ইঙ্গিত করেই সেটা সে স্পষ্ট বুঝতে পারল। স্টলে যে ছেলেটি আর মেয়েটি আছে, তাদের মুখেও একটা হাসির ঢেউ খেলেই মিলিয়ে গেল। 

মাধব এসব অগ্রাহ্য করে ছেলেটিকে থাইল্যাণ্ডে যাবার খরচ কতো সেই প্রসঙ্গে চলে এল। ছেলেটি মাধবের হাতে একটা ছোটো কাগজ ধরিয়ে দিল, যেটায় চোখ বুলিয়ে মাধব বুঝতে পারল অন্তত সত্তর-আশি হাজার টাকা না থাকলে দু’জনের থাইল্যান্ড যাওয়া কঠিন। তবু লজ্জার মাথা খেয়ে সে জিজ্ঞেস করল এর চেয়ে কম খরচে যাওয়া যায় কিনা। মেয়েটি সে ব্যাপারে কিছু বুঝিয়ে বলতে যাচ্ছিল, ছেলেটি তার আগেই তাকে থামিয়ে দিয়ে ঘাড় নেড়ে না জানিয়ে দিল। এদের পেছনে সময় নষ্ট করে যে লাভ নেই সেটা ছেলেটি অভিজ্ঞতা থেকেই বুঝে নিয়েছিল। ক্রমশ বাকি স্টলগুলোয় ঘুরতে ঘুরতে মাধবরা বুঝতে পারছিল এ জায়গা তাদের জন্য নয়। চারদিকের মানুষজনের মধ্যে তারা অত্যন্ত বেমানান। 

স্টেডিয়াম থেকে বেরিয়ে এসে মাধব মিনতিকে বলল- “তোমাকে আমি বাসে তুলে দিচ্ছি, তুমি বাড়ি চলে যাও। আমি একটা কাজ সেরেই সোজা বাড়ি চলে যাব।” মিনতি বুঝতে পারছিল মাধবের অসহায়তার কথা। হয়তো সে একটু একা থাকতে চায়। হয়তো মাধব ভাবছে বৌয়ের চোখে সে ছোটো হয়ে গেল, বিয়ের পর তার একটা শখ পূরণ করতে না পারায়। কিন্তু এরকম কিছু যে নয়, মিনতি সেটা মুখ ফুটে বলে উঠতে পারল না। শুধু বাসে ওঠার আগে মাধবের হাতটা শক্ত করে একবার ধরে বলল- “তাড়াতাড়ি ফিরো। তুমি কাছে থাকলেই আমি সবচেয়ে বেশি খুশি হবো, আর কিছুর দরকার নেই।” মাধবের বুকের কাছটা এক নিমেষে হাল্কা হয়ে গেল। তারপর আস্তে আস্তে সে পা বাড়াল ধর্মতলার দিকে।

হোটেলের ব্যালকনিতে বসেই সমুদ্র দেখা যায়। চেয়ার টেনে এনে সন্ধের পর তারা দু’জনেই বসে বসে সমুদ্রের আবছা ওঠানামা দেখছিল। আজ সকালেই তারা এসে পৌঁছেছে এখানে। মালিকের ছেলের চেনাশোনা আছে এই হোটেলে, ফোন করে বলে দিতেই কাজ হয়ে গেছে। উপরন্তু তিন দিনের ছুটিও পাওয়া গেছে। 

হাল্কা ঠাণ্ডা পড়তে শুরু করেছে। পাতলা একটা চাদর গায়ে জড়িয়ে নিতে নিতে মিনতি মাধবের আরো কাছে সরে এল। তারপর জিজ্ঞেস করল-“হ্যাঁ গো, থাইল্যান্ডের সমুদ্র কি এর চেয়েও ভালো? আরো আলাদা কিছু?” মাধব বৌকে হাতের বেড় দিয়ে কাছে টেনে নিয়ে বলল-“দূর পাগলি, সমুদ্র তো সব জায়গাতেই একরকম। এই দীঘাতেও যা, ওখানেও তাই। আর, তুমি পাশে থাকলে সব জায়গাই সমান। শুধু শুধু অতদূর না গিয়ে ভালোই হয়েছে।”  মাধবের হাতটা শক্ত করে জড়িয়ে ধরে তার কাঁধে মাথা রাখল মিনতি। নোনা হাওয়ার ঝাপটা ক্রমশ আরো গাঢ় হয়ে উঠল…

Leave a Reply

Your email address will not be published.