সংকরায়নে জন্ম নেয় বিকলাঙ্গ বোধ

সুস্মিতা বোস

প্রথম যখন কলম ধরেছিলাম স্বাভাবিক কিছু লিখব বলে, বিক্ষিপ্ততার রসায়নে স্বাদ বদলের চক্রব্যূহে কলম লুকিয়ে পড়েছিল। এই অতি আধুনিক যুগে আমরা কলমের থেকে কীপ্যাডেই বেশি অভ্যস্ত। বারান্দায় আলুথালু বেশে বসে থাকা ভাবনার হাসি থেকে কান্না সবটাই কুড়িয়ে এনে ঝেড়ে ফেলে দিই। না, ডাস্টবিনে নয় কোথাও একটা যেখান থেকে সৃষ্টির বিনম্র অনুরোধ কানে এসে পৌঁছায়। তারপর হাতেখড়ির গল্পগুলো সাদামাটা পোশাকে আলনা খুঁজে নেয় কেননা আলমারিতে ছায়া শীতল আশকারা। আমরা সাধারণের খেলায় গা ভাসিয়ে দিই, অসাধারণের বন্দুক তাক করা থাকে বুকে। ‘সাধারণ’ না ‘অসাধারণ’ কোনটা হয়ে উঠতে পারলে মায়ের প্রসব যন্ত্রনাকে সার্থক করা যাবে সেই ভাবনায় কেটে যায় কয়েকটা যুগ আর একটা গোটা জন্ম। মায়েরা তাদের জীবনের গুটি কয়েক বছর লিখে দেন আমাদের নামে, আমাদের উপাধি ‘উত্তরসূরী’।     

‘অনুসরণ’ আর ‘অনুকরণ’ এই দুইয়ের মাঝে অণু পরিমাণ পার্থক্য আছে।
অনুসরণে জ্ঞানের প্রাচুর্য আছে আর অনুকরণে আছে অন্যের আত্তীকরণে নিজ সত্তার অপভ্রংশ রূপ। তাই এসব কথা বিচার করেই গণ্যমান্য ব্যক্তিদের চিন্তাধারার সাথে পাতায় পাতায় পরিচিতি বাড়লেও নিজেকে ভেঙে নিজের অদ্বিতীয় সংস্করণের মুখোমুখি হতে পারছিলাম না। ধ্বংসস্তূপে জন্ম নিচ্ছিল অনুকরণের দুর্গন্ধ যার ধর্ম কর্পূরের মতো নয়। জ্ঞানের পিঠে জ্ঞানের আঁচিলে যদি অভিনব কাঠামোর বোধন সম্ভব হয় তবেই নিজের লোকালয়ের সীমারেখা ছাড়িয়ে পৃথিবীর বাকি লাইব্রেরিগুলিতে পায়চারি করার দুঃসাহস দেখানো যায়।

গর্ভে জন্মানোর সূত্র জমা রেখে ভূ-আলোকে আমরা শরীর সেঁকে নিয়ে বছরের ঘাড়ে বছর চাপিয়ে ষাট-সত্তর পার করে দিই, কখনো আবার চল্লিশের রাশি রাশি অভিজ্ঞতাকে ফাঁকি দিয়ে জীবনের বাইরের উপন্যাসটাকে উল্টে দেখার একটা তাড়া ভর করে রোগাক্রান্ত শরীরে। আমাদের চোখের সামনে একটা একঘেয়ে সমাজের দস্তাবেজ খুলে রাখা হয়। রোজনামচার নামতা মুখস্ত করতে বলে কাপ-প্লেটের ঝনঝন শব্দ। কখনো দুধ কখনো বা চিনি ছাড়া লিকার এসবে দ‍মিয়ে রাখা হয় মস্তিষ্কের চিৎকার। একটা শরীরে মিশিয়ে দেওয়া হয় আরেকটা শরীর যাতে নবজাতকের ঠিকানা হয়ে উঠতে পারে এই পৃথিবী।

সম্পর্কের এক একটা খোলসে ভিন্ন ভিন্ন স্বাদের সুর বাজতে থাকে। কোনোটির নাম ‘দাম্পত্য’, কোনোটির নাম ‘খোলামেলা যৌবন’, কোনোটি ‘চিরস্থায়ী’ কোনোটি আবার ‘তাসের ঘরের স্বপ্নসুখ’। সব ডাকনামগুলোকে একটা তারে বেঁধে বেঁধে রাখা যায় যদি তার নাম রাখা হয় ‘বন্ধুত্ব’। কোনো শরীরে মেদের অলংকরণ, কোনো শরীর ছিমছাম, কিছু কিছু মুখে হাসির ফোয়ারা আবার কয়েকটি মুখে বিষাদের ঘন কালো মেঘ জমেছে কালের কাঁটাতারের ফরমান অস্বীকার করে। তবুও সবাই মানুষ। মিশ্র সভ্যতার বংশধর। মিশ্রনের নেতিবাচক রূপে বিকলাঙ্গ শিশুর আর্তনাদ সুস্পষ্ট আর ইতিমূলকতায় দিগন্ত বিস্তৃত নীলিমার গান শোনা যায়।

  ‘ভালোবাসা’ শব্দোচ্চারণে চিহ্নিত হয়ে গেছি উগ্রপন্থী বলে, যেন যুগান্তরে দুঃসময় বহন করে চলেছি আমি থেকে আমরা হয়ে। প্রকৃতি প্রেমীর টোপর মাথায় দিয়ে শহর যদি ঘরে ঘরে ডোরবেল বাজাত তাহলে হয়ত ভালোবাসায় এত বিষ থাকত না-শ্বাসকষ্টে ভুগত না প্রতিটি মন। ইনহেলারের প্রয়োজন ফুরোতো। বিদ্বেষের চামড়া ঝলসে গেলে সুখের চাদরে মোড়া ভালোবাসার গৃহপ্রবেশ দেখত সবাই।শরীরে শরীর মেলে, মনে মনের ঘন নিশ্বাসও জমা হয় কিন্তু মানুষের বিশ্বাস ঘুণে ধরা।মিছিল ক্লান্ত হয়, স্লোগানে বরফ জমে। দেওয়ালে কান পাতলে শোনা যায় লোকচক্ষুর আড়ালে পাহাড়ও নতজানু হতে চায় সমুদ্রের নাগাল পেলে।

বিবর্ণতা মুছে প্রান্তরে প্রান্তরে রোপণ করতে ইচ্ছে হয় বোধের চারা। পরিব্রাজকের যাত্রাপথে অখন্ডতার মানচিত্র পাতা থাকুক। হেঁটে যাওয়ার সময় টুকরো হয়ে আসা অতীত জোড়া লেগে গিয়ে ভাবীর কপালে এঁকে দেবে রাজতিলক। মিশেলে স্বকীয়তা দূরে ঠেলে দিলে তুলনা এসে বাসা বাঁধে মনে। হীণমন্যতায় হানাহানি মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। ধর্মপুস্তকে সাময়িক শান্তি আসে, কালান্তরের সংকরায়ন রুখতে আমিত্বকে বাঁচিয়ে ‘আমরা’র সজ্জায় অগ্রসর হতে পারি আমরা। বোধের সংকীর্ণতা রুখতে নিজেকে মাটির সমতুল্য করে ধারকের পোশাক কিনে নিলে সংকরায়নও সংকট থেকে মুক্ত হতে পারে।

One thought on “সংকরায়নে জন্ম নেয় বিকলাঙ্গ বোধ”

Leave a Reply

Your email address will not be published.