বিচিত্র

অনুসূয়া ওঝা

কিছুদিন আগেরই ঘটনা। আগের বছর শীতের সময়। দিনটা সম্ভবত শনিবার ছিল। রাতে দিদির কাছ থেকে পড়ে বাড়ি ফিরবো বলে দাঁড়িয়েছিলাম শ্যামনগর স্টেশনে। রাত ৮:৫০ এর কল্যাণী সীমান্ত। তখনও  ঘোষণা হয়নি ট্রেনের। স্বভাবতই একটা চায়ের দোকান থেকে চা কিনলাম। মাটির ভাঁড়ে চুমুক দিতেই একটা ঘটনা আমার দৃষ্টি আকর্ষন করলো। দূরে একটা লোক। বয়স আন্দাজ এই ষাট কী পঁয়ষট্টি হবে। পরনে একটা খাকি রঙের প্যান্ট আর গায়ে চেক শার্ট। ঠান্ডা লাগার জন্য উপর একটা জ্যাকেট ও আছে। লোকটির বহিঃপ্রকাশে অযত্নের ছাপ স্পষ্ট।

লোকটা একটু পাগল গোছের। দেখলেই যে কোন সাধারণ ব্যক্তির কেমন যেন অভক্তি আসবেই। দূরের কোন ব্যক্তিকে কিছু একটা জিজ্ঞাসা করতে গিয়ে ব্যক্তিটি তাকে দূর দূর করে তাড়িয়েও দিল। তারপর চারপাশে একবার দৃষ্টি প্রদর্শন করেই চায়ের ভাঁড়ে চুমুক দিলাম আমি। আড়চোখে লক্ষ্য করলাম সেই পাগল লোকটি যাত্রা দিয়েছে আমার দিকেই। কাছে আসতেই দেখলাম তার মুখে পুরো সাদা দাঁড়ি তে ভর্তি,মাথার চুলও সাদা। দেখে বুঝতে বাকি নেই যে লোকটা ভবঘুরে।

পাগলটা ইতিমধ্যে আমার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে আর আমার মুখের দিকে তাকিয়ে আগাপাছতলা কিসব চিন্তা করছে। আমি একবার আড়চোখে তাকিয়ে তাকে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলাম।কিন্তু ব্যক্তিটি খুব মৃদু স্বরে ডাকল, “বাবা! একটু শুনবে?” প্রশ্নটা যে আমাকে করা হয়েছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। আমি মুখ ঘুরিয়ে তাকে উত্তর দিলাম, ” হ্যাঁ কাকা, বলুন”। ততক্ষণে আমি মনে মনে কল্পনা করে নিয়েছি তিনি নিশ্চয়ই আমার কাছ থেকে কিছু সাহায্য চাইবেন। কিন্তু তার আগামী প্রশ্ন আমার ভ্রম ভেঙে দিল।

 “বাবা তুমি কি সাইন্সের ছাত্র?” 
” হ্যাঁ। কেন?” 
“তাহলে আমার একটা প্রশ্নের উত্তর বলে দিতে পারবে? আসলে আমি ভুলে গেছি। কিছুতেই মনে পড়ছে না।আর কেউ সাহায্য করছে না। যদি তুমি…..”। তার কথা বলা শেষ হওয়ার আগেই আমি বললাম, ” বলুন না! দেখি পারি কিনা।” পাগল টার মুখে তখন এক শিশুসুলভ হাসি ফুটে উঠলো, যে হাসি আমার মনটাকে কেমন যেন এক আনন্দে ভরিয়ে দিল। আমায় জিজ্ঞাসা করল, “ডিফারেন্সিয়াল ইকুয়েশন বোঝো? আমাকে বোঝাবে? একদম মনে পড়ছে না। পুরো ভুলে খেয়ে নিয়েছি।”
তার প্রশ্ন আমাকে আশ্চর্য করলো। এরকম পাগলাটে দেখতে একটা লোকের মুখে এই প্রশ্ন আমি কল্পনা করি নি। পাঁচ সেকেন্ড হাঁ করে তাকিয়ে থাকলাম তার দিকে। তারপর বোঝাবো কি করে বুঝতে না পেরে, আমার ফোন বার করে ইন্টারনেট দেখে বুঝিয়ে দিলাম। দেখলাম লোকটা বেশ মজা পেয়েছে। আবার জিজ্ঞাসা করল, “ফিজিক্স পারবে?” আমি লজ্জিত হয়ে বললাম,” প্রশ্ন করুন। পারতেও পারি, নাও পারি। এজন‍্য কর্তৃপক্ষ দায়ী নয়।” মানুষটি তখন হো হো করে হেসে উঠল। হাসির জোর এতই বেশি যে তখন আশেপাশে থাকা সমস্ত যাত্রীর নজরের কেন্দ্রবিন্দু তখন আমি। মানুষটা তার হাসি থামালো। তারপর বলল, “কম্পন হয় কিভাবে? মানে গিটার বাজানো ওই সুরটা আসে কি করে?” আমি ম্যাথমেটিক্সে অনার্স। দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র। পাশে আবার ফিজিক্স,কেমিস্ট্রি আছে। তাই এটা আমার কাছে সহজই ছিল। উত্তর দিয়ে দিলাম। লোকটাও বেজায় খুশি। এবার আমারও উৎসাহ খুব বেড়ে গেল, লোকটা সম্বন্ধে জানার। মানুষটার কথা শুনে স্পষ্ট বুঝলাম, তিনি একজন ভদ্রলোক। কিন্তু হঠাৎ এরকম দশা কেন সেটা জানার খুব ইচ্ছা হলো আমার।

আমি তাকে প্রশ্ন করলাম, “কি করেন আপনি?” লোকটা ও উত্তরে বলল, “আমি Laban Hard Vidyapith এর অবসরপ্রাপ্ত অংকের টিচার।” শুনে তো আমি থ। একজন স্কুলের টিচার তাও আবার কলকাতায় ইংরেজি মিডিয়াম স্কুলের। তার এই দশা! আরো শুনতে ইচ্ছা হলো তার সম্বন্ধে। ইতিমধ্যে স্টেশনে ট্রেনের খবর হল,” কল্যাণী যাওয়ার গাড়ি, কল্যাণী সীমান্ত লোকাল, এক নম্বর প্লাটফর্মে আসছে।”

 আমি আবার জিজ্ঞাসা করলাম, “তা এত রাত হল, কাকী অপেক্ষা করছে না?” সে উত্তরে জানাল আজ দুবছর এক মাস ১৭ দিন হতে চলল তার স্ত্রী আর একমাত্র পুত্র তাকে ছেড়ে পাড়ি দিয়েছে সেই ঘুমের দেশে। সে আরো বলল, “দিনটা ছিল ১৮ জানুয়ারি ২০১৭, স্পষ্ট মনে আছে এখনো গাড়িটা অ্যাক্সিডেন্ট করলো। আমিও ছিলাম গাড়িতে। তবুও ওরা আমরা নিল না জানো। ফেলে গেল এখানে। একা একা।” দেখলাম তার চোখের জল গড়িয়ে পড়ছে তার গাল বরাবর। ইতিমধ্যেই দেখলাম ট্রেন ডুকছে। কাকা বলে উঠলো, “বাবা তুমি কোথায় নামবে?” আমি বললাম, “কল্যাণী”। কাকা আবার কি একটা গননা করতে বসে পড়ল। ঠিক তার পরেই কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে ট্রেনটা ঢুকলো, আর আমার সাথে কাকা উঠে পড়ল ট্রেনে।

“তা কাকা আপনার কোথায় থাকা হয়?” আমি প্রশ্ন করলাম। উত্তর তিনি জানালেন তিনি শ্যামনগর এই থাকেন। আর আমায় দেখে পছন্দ হল তাই ট্রেনে উঠে পড়লেন। আমি বুঝলাম লোকটার মাথায় একটু হলেও খারাপ তো আছেই।তিনি বললেন, “জানো বাবা, আমার ছেলেটাও তোমার মতই ছিল অংকে M.Sc করছিল। ভগবান কেড়ে নিল তাকে। আজ তোমায় দেখে তার কথা বড় মনে পড়ছে।” এরকম আরও কিছু কথা হতে হতে কখন যে কাঁকিনাড়া পার হয়ে গেল বুঝলাম না। মানুষটাকে দেখে বড় মায়া হচ্ছিল আমার। মুখে কষ্টের ছাপ স্পষ্ট। নিজের চোখের সামনে স্ত্রী-পুত্রের হারানোর কষ্ট তাকে পুরো ভেঙে দিয়েছে। টুকরো টুকরো করে দিয়েছে ভেতর থেকে। শুধু পড়ে রয়েছে বাইরের শেল টুকু। কাকা তখন সিট থেকে উঠে দাঁড়াল। আমার দিকে তাকিয়ে কিছু একটা বলতে গিয়ে আবার বসে পড়ল।আমার হাতটা ধরে বললেন,”এই দু বছরে এতদিন পর শান্তি পেলাম।কেউ ভালো ব্যবহার করেনি। কেউ আপন করে নেয়নি তোমার মত।” কয়েক সেকেন্ডের বিরতি নিয়ে তিনি আবার বলতে লাগলেন,”সবাই দূর দূর করে তাড়িয়েছে। কিন্তু তুমি তেমনটি করনি। তোমার মতো মানুষ খুব কম আছে। তুমি বড় হও, আরো বেশি উন্নতি করো।” তারপর জানলার দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘ শ্বাস নিয়ে,ছল ছল নয়নে আবার বলল,”তুমি আমার ছেলের কথা মনে করিয়ে দিলে। খুব অভাব লাগছে তার।” বলে কাকা উঠে পড়লো সিট থেকে। উঠে চলে গেলেন সোজা দরজার দিকে। রাতের ট্রেন। এমনি ট্রেনের দরজা ফাঁকা থাকে। তার উপর শীতকাল। ভাবলাম সামনে নৈহাটি, কাকা হয়তো ওখানে নেমে আবার শ্যামনগরের দিকে চলে যাবে। তাই আমিও ওই সব ভুলে হেডফোন বার করে গান চালিয়ে বসে থাকলাম। এক নাগাড়ে জানলা দিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে থাকলাম। আজ বাইরের পরিবেশটা কেন জানি না খুব অন্ধকার মনে হচ্ছে।খুব নিস্তব্ধ, খুব একা মনে হচ্ছে।

এরই মধ্যে হঠাৎ হেডফোনের মধ্যে চলতে থাকা তীব্র গান কে ভেদ করে এগিয়ে এল কিছু শব্দ। ওই দিকে মুখ ঘোরাতেই দেখলাম দরজার কাছে লোকের ভিড়। দেখলাম কাকার কোন চিহ্নই নেই। আমার বুকের ভেতরটা পাথর হয়ে গেলো। কাকা কই? চোখ শুধু তখন কাকাকে খুঁজছে। ভিড়ের মধ্যে একটা লোক বলে উঠল,” যা পাগলটা ঝাঁপ মারল? গেল লোকটা!” মনটা অস্থির হয়ে উঠল। এই দেখলাম কাকাকে আর এই নেই? প্রিয় মানুষদের হারানোর যন্ত্রণা, লোকের দেওয়া লাঞ্ছনা, শেষে তার প্রানটা এইভাবে কেড়ে নিল? ভেবে চোখে জল এলো আমার। চোখ বন্ধ করে নিজেকে সান্ত্বনা দিলাম, “থাক!শেষ অব্দি আমি তো ভালো ব্যবহার করলাম।” আর মনে পড়তে লাগল তার শেষ কথাগুলো। হয়তো আজ তার নিজের ছেলেকে দেখতে বড় ইচ্ছা করছে তার। আমি শুধু এইটুকু আশা করি তিনি যেন তাঁর ছেলে এবং স্ত্রীকে দেখতে পারেন।

অজ্ঞাত পরিচয়ের পাগলটা আমার স্মৃতিকে কতদিন আঁকড়ে ধরে থাকবে জানা নেই। কিন্তু এই কিছু সময়ে কাকাকে নিজের করে নিয়েছিলাম। আজও যখন শ্যামনগর স্টেশন দিয়ে ট্রেনটা যায়, স্টেশনটাকে দেখলে সেই কাকার কথা খুব মনে পড়ে।

One thought on “বিচিত্র”

Leave a Reply

Your email address will not be published.