সাহিত্যCafe – ধারাবাহিক উপন্যাস

পাতাবাহার
প্রত্যূষা সরকার 


▪️পর্ব: ১▪️
“মা, জোর কোরো না। আমার ভালো লাগছে না।” 
“এতোটুকু বাচ্চা, নাক টিপলে দুধ বেরোয়ে, কী পাকা পাকা কথা শিখেছে!” 
“আমি যাবো না… কিছুতেই যাবো না।” 
“এবার একটা মার লাগাবো। এই দেখো, কী অসভ্য হয়েছে তোমার ছেলে। সব ভার আমার ওপর চাপিয়ে উনি ছুটলেন। ধ্যাৎ আর ভালো লাগে না!”
বলতে বলতে থপ করে মেঝেতে বসে পড়লো সুজাতা। একটু শান্ত হয়ে দেয়ালে তাকালো। ততক্ষণে সন্তু ঘরে ঢুকে দরজা দিয়েছে। ব্যাস আবার চিৎকার শুরু, 
“অ্যাই ছেলে, তুই আমায় শান্তি দিবি না? বাঁদর কোথাকার! বেরো ঘর থেকে। রাগ হয়েছে বাবুর। এখনও প্রাইমারি স্কুলের গণ্ডি পেরোতে পারলো না, এদিকে বাপের মতো পোঁদ ভরা রাগ। আমি দশ গুণবো বলে রাখলাম। না বেরোলে দেখ তোর আজ একদিন কী আমার একদিন!”
দরজাটা ফট করে খুলে এক দৌড়ে বাইরে বেরিয়ে গেলো সন্তু। সুজাতা আরও জোরে চিৎকার শুরু করলো। 

সন্তু অর্থাৎ সায়ন্তন সেন, সুজাতার একমাত্র সন্তান। ক্লাস ফোরের স্টুডেন্ট। ছেলেটা মেধাবী। প্রচণ্ড ছটফটে আর টকেটিভ। তবে ইদানিং কথা বলাটা কমেছে। একদম চুপচাপ থাকে। মায়ের বকুনির বাইরে ওর নিজস্ব বলতে বাবার ছবি আর বাড়ির সামনের ছোট্টো বাগানটা। এটা যদিও ওদের নিজেদের বাড়ি নয়। প্রায় চার বছর হলো ওরা মা ছেলেতে এই একটা ঘর বাথরুম সহ ভাড়া নিয়েছে। বাড়িটা অনেকটা বড়ো। ওপাশে বাড়ির মালিকের সংসার। যদিও মালিক থাকেন রাজস্থানে। ছ মাসে একবার এসে বউ বাচ্চাকে দেখে যায়। সুজাতা ঘর জুড়ে রাতদিন টিউশন করে। তাছাড়া শায়া-ব্লাউজের বিজনেস ধরেছে কয়েক মাস হলো। এই ছোট্টো ছেলেকে নিয়ে একার সংসার। অনেক কষ্টে ছেলেটাকে প্রাইভেট ইংলিশ মিডিয়ামে পড়াচ্ছে। আসলে সন্তুর বাবা, বিধায়ক নিজে হাত ধরে নিয়ে গিয়ে ছেলেকে এই স্কুলে ভর্তি করেছিলো। তখনও অবস্থা খুব একটা ভালো নয় ওদের। একটা প্রাইভেট সেক্টারে জেরক্স মেশিন চালাতো বিধায়ক। অ্যাক্সিডেন্টে বিধায়কের পা দুটো চলে যায়। মনের জোর একেবারে কমে আসছিলো দিন দিন। ঘটনার মাস খানেক পর ঘুমের ওষুধ খেয়ে সুইসাইড করে। তারপরেই এই মা ছেলের জীবনযুদ্ধ শুরু।

বাগানে চুপচাপ বসে আছে সায়ন্তন। সুজাতা হাতে গরম খুন্তি নিয়ে এগিয়ে আসতেই শরীরটা কেঁপে ওঠে সায়ন্তনের।  
“আমি একা একা স্কুল যাবো না, তুমি নিয়ে গেলে যাবো।” 
সুজাতা চুপচাপ ঘরে চলে যায়। কিছুক্ষণ পর আবার ডাক পড়ে, 
“সন্তু আয় খেতে দিয়েছি। আমাকে বেরোতে হবে। তাড়াতাড়ি।”
মুখ গোম করে এক পা দু পা ফেলতে ফেলতে গিয়ে জিজ্ঞেস করে, 
“আমাকে স্কুলে দিয়ে আসবে তো আজকে?” 
“না সোনা, আজ তো হবে না, আজ বাসে চলে যাও…”
মুখ নিচু করে একটা একটা করে দলা পাকানো ডাল ভাত মুখে পুরতে থাকে সায়ন্তন। হাঁ করে তাকিয়ে থাকে জানলার বাইরে। জানলার ঠিক বাইরেই হলুদ দেয়াল। ওপাশে রুমকি কাকিমার ঘর। রুমকি হালদার, এ বাড়ির মালিকের সেকেণ্ড ওয়াইফ। প্রথমজন বিয়ের ঠিক এক মাস বাদে অ্যাক্সিডেন্টে মারা যায়।

সাদা শার্টটা গায় চাপিয়ে প্যান্টের ভেতর গুঁজতে যায় সায়ন্তন। প্যান্টটা ফাঁকা করতে গিয়ে একবার তাকিয়ে নেয়ে ভেতরে।  
“আঃ” 
“কী হলো, এখনও রেডি হোসনি?”
সুজাতা এসে মুখের দিকে তাকাতেই সায়ন্তন তাড়াতাড়ি করে প্যান্টটা আটকে নেয়। কোনও কথা না বলে পিঠে ব্যাগটা নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে যায়।  
“টিফিন যেন পড়ে না থাকে। আর আমি না ফেরা অবধি রুমকি বৌদির কাছে থাকবি। অসভ্যতা করবি না, কিছু দিলে খেয়ে নিবি। দুগ্গা দুগ্গা!”

বাইশ বছর পরেও রাস্তাটা বদলায়নি। সায়ন্তন এখান দিয়েই স্কুল থেকে ফিরতো। হাতে একদিন কচি আমড়া তো অন্যদিন পেয়ারা মাখা… দু হাতে দুটো রামের পাঁইত নিয়ে খানিকটা টলতে টলতে এসে পৌঁছালো ফ্ল্যাটে। সাউথ সিটি মলের থেকে দশ মিনিট হেঁটে গেলেই ফ্ল্যাটটা। আগে এখানে দু চারটে বাড়ি যাও বা ছিলো, সব ভেঙে ফ্ল্যাট হয়ে গেছে। ওদের ভাড়া বাড়িটার কথা দিব্বি মনে আছে সায়ন্তনের। তবে ও পথে আর যায়নি বাইশ বছরে একদিনও। উচ্চমাধ্যমিক পাশের আগেই মা ছেলেতে বাড়ি ছেড়েছিলো। সায়ন্তন ব্যানার্জি এখন এক্সিকিউটিভ ম্যানেজার। সকালবেলা ঝাঁ চকচকে দিন শুরু হলেও সন্ধের পর আর এ জগতে থাকেন না তিনি। ভায়োলিনের হালকা আমেজের সঙ্গে রাম আর কাবাব তার আলটিমেট স্যাটিসফিকশান। কাবাবটা অবশ্যই মাংসের।

লিফ্ট থেকে বেরিয়ে এদিক ওদিক তাকিয়ে ঘরে ঢুকলো সায়ন্তন। ডাইনিং টেবিলে বোতল দুটো রেখে মোমবাতি ধরায়। তারপর ধোঁয়া ওঠা রান্নাঘর থেকে কাচের ডিশে কাবাব সাজিয়ে এনে ভায়োলিনটা নিয়ে গিয়ে ব্যালকনিতে ঝোলানো দোলনায় বসে পড়ে। খুব ছোটোবেলা থেকেই দুর্দান্ত ভায়োলিন বাজায় সায়ন্তন। সুজাতা আধপেটা খেয়ে হলেও ছেলেকে অঙ্ক ইংরাজি আর ভায়োলিনের টিউশনটা দিয়েছে অভাবের সংসারে। দু সিপ গলায় ঢেলে এক নাগারে আধ ঘন্টা বাজিয়ে চলে সায়ন্তন। তারপর একটা একটা করে কাবাবের পিস মুখে দেয়। 
“উফ, মা কী টেস্টি বানিয়েছো গো! ইয়াম্মি… কী? কী বলছো? ইয়াম্মি? ইয়াম্মি মানে বোঝো না? আরে টেস্টি টেস্টি, মুখে দিলেই মাখন!”

সুজাতা সেদিন একটু দেরি করেই বাড়ি ফিরেছিলো। সায়ন্তন রুমকি কাকিমার জানলা দিয়ে ওদের ঘরের দিকে তাকিয়ে আছে তখন। রুমকি এসে ঝপ করে জানলাটা বন্ধ করে দিলো। ঘরের ভেতর বিভৎস ধোঁয়া।  
“আমি নিশ্বাস নিতে পারছি না, বন্ধ কোরো না জানলাটা… কাকিমা” 
“চুপচাপ বসে থাক এখানে। তোর মা আসতে অনেক দেরি। বেশি ট্যা ফুঁ করলে না…” 
“না, প্লিজ আমাকে ছাড়ো! কাকিমা… আমার খুব লাগে।”

ভায়োলিনটা দোলনায় রেখে হুট করে উঠে পড়ে সায়ন্তন। গপ গপ করে বাকি পিসগুলো শেষ করে। হায়নার মতো বেরিয়ে আসতে থাকে দাঁত জিভ। মেঝেতে লালা পড়ে। খানিকটা শুকনো লঙ্কার গুড়ো ছিটিয়ে নেয় বোতলে।  
“শুকনো লঙ্কা দিয়ে মদ, আঃ তুম কেয়া সামঝো গে সুজাতা দেবী!… কী যে বলো মাতারানি, এর যা স্বাদ…”
টলতে টলতে কোনও রকমে বেডরুমে পৌঁছায় সায়ন্তন। বিছানায় ফেলে দেয় গোটা শরীরটা। গড়াগড়ি খেতে খেতে বলতে থাকে, 
“ও মা, লাইটটা নেভাও না। ঘুম আসছে না। কী গো…”
বিছানা থেকে উঠে গিয়ে ঠিক সামনে সোফার কাছে হেঁটে যায় সায়ন্তন। সুজাতার পায়ের কাছে বসে পড়ে।  
“কী গো, এখনও ঘুমাচ্ছো?”
আস্তে আস্তে সুজাতার বাঁ হাতটা ধরে, তারপর বিড়বিড় করতে করতে মায়ের কাছে ঘুমিয়ে পড়ে। 

সায়ন্তনের ঘুমের মধ্যে দশ বছরের সন্তু প্রতিদিন ঘোরাফেরা করে। স্কুল থেকে টিউশন বা কোনও কোনও দিন রুমকি কাকিমার আবছা অন্ধকার বেডরুমটা… ভয়ের চোটে সুজাতাকে জড়িয়ে ধরে।  
“আমি একা একা স্কুল যাবো না… তুমি বুঝতে পারছো না, এঘরেই থাকবো। কাকিমা ভালো না। আমি মিথ্যে কথা বলছি না মা। ও খুব খারাপ।”

ভোরবেলা চোখেমুখে জল দিয়ে সায়ন্তন জগিঙে যায়। এ সময় একটা অন্যরকম সায়ন্তন। ভীতু একেবারেই নয়। বরং একটা গাম্ভীর্যের ছাপ চেহারা জুড়ে। আটটার সময় গা গরম করে বাড়িতে ফিরে একটু জিরিয়ে রেস্ট নিতে নিতে পুষ্প চলে আসে। বেডরুম ছাড়া বাকি ঘর পরিষ্কারের দায়িত্ব পুষ্পর। সাথে একবার রান্নাটাও করে দিয়ে যায়। 
“স্যার, লেবু জল…” 
“হুম” 
“শোনেন, রান্নাঘরের হাল এরম রাখলে আমি আর আসবো না বলে দিলাম।” 
“সে তো তোর রোজের বায়না। তা আজ আবার কী হলো?” 
“এতো ধোঁয়া কেন? ইস! কী পোড়া পোড়া গন্ধ!”
সায়ন্তন মুচকি হাসে পুষ্পর দিকে তাকিয়ে। তারপর বলে, 
“কাল খাওয়াবো।” 
“কী?” 
“ওই যে যেটা পোড়াই…” 
“কী পুড়িয়ে খান? বনমানুষ নাকি?” 
“হ্যাঁ” 
“মানে? ইস!” 
“মানে… মাংস।” 
“থাক লাগবে না। না পেয়ে পেয়েছি ধন, নিয়ে করি কীর্তন” 
“কী? কিছু বললি?” 
“না মানে, এই যে আপনি রাঁধতে পারেন, তাই আর কী…” 
“তা খাবি তো?” 
“কী খাবো?” 
“ওই যে বললাম… মাংস”

স্নান সেরে বেডরুমে ঢুকে দরজাটা বন্ধ করলো সায়ন্তন। বাইরের ঘরে পুষ্প ওর মতো কাজ করে যায় এ’সময়। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে সারা গায় বডি স্প্রে লাগালো প্রথমে। তারপর প্যান্টটা তুলে পাউডার দিলো ভেতরে। সাদা শার্টটা গায় চাপিয়ে এপাশ ওপাশ দেখে নিলো আয়নায়। হঠাৎ ফোনের আওয়াজ।  
“উফ! এই সময় শিওর অফিস থেকে…”
ফোন ধরেই চুপ করে গেলো সায়ন্তন। তারপর তাড়াহুড়ো করে বললো, 
“না, এখন কাস্টমার বন্ধ। আরে বলছি তো বন্ধ। প্লিজ। হোয়াট দ্যা…”
ফোনটা কেটে গটগট করে ঘর থেকে বেরোলো। পুষ্প ডাইনিং মুচ্ছিলো। 
“এই তোর হয়েছে? অফিস বেরোবো তো।” 
“আর একটুখানি…” 
“তাড়াতাড়ি কর। তালাটা না দিয়ে তো যেতে পারবো না।” 
“এই হয়েছে জ্বালা। কত দিন থেকে বলছি একখান বৌদি লাগবে আমার… কে কার কথা শোনে!” 

সায়ন্তন চুপচাপ ব্যালকনিতে গিয়ে দাঁড়ালো। 
“পুষ্প এবার ছাড়। আর মুছতে হবে না। ড্রাইভার এসে গেছে।”
বালতির জলটা কোনওরকমে বাথরুমে ফেলে পুষ্প বেরিয়ে গেলো। সায়ন্তন চিৎকার করে বললো, 
“মা আসছি… দুগ্গা দুগ্গা!”

তালাটা আটকে লিফ্টের সামনে এসে দাঁড়ায় সায়ন্তন। পকেট থেকে সাদা রুমালটা বের করে কানে ঘাড়ে একটু পাফ করে নেয়। মাবাইল স্ক্রিনে দেখে নেয় মুখটা। লিফ্টের দরজাটা খুলতেই হাঁফ ছাড়ে। তারপর বিড়বিড় করে বলে, 
“মা তো এখনও আমায় ইয়াং বলে, আর একবার কি ট্রাই নেবো!”

ক্রমশ..

Leave a Reply

Your email address will not be published.