পাতাবাহার – পর্ব: ৪

প্রত্যূষা সরকার

ফ্ল্যাটে ফিরতে রাত হয় সায়ন্তনের। আজ রাতটা পুরোনো ফ্যাক্টরিতে কাটিয়ে আসবে ভেবেছিলো, কিন্তু সকালে অফিস থাকায় সেটার আর সুযোগ হয়নি। পরের দিন সকালে ঘুম থেকে উঠে গায় জ্বর অনুভব করে সায়ন্তন। বেডরুমটা খুলে দেয়। পুষ্প এই প্রথম ধুলো ঝাড়তে এ ঘরে আসে। 
“ইস! কী অবস্থা ঘরটার… এতোদিন বলেননি কেন? এই ময়লা তুলতে আমার বছর লেগে যাবে।”
সায়ন্তন চুপচাপ খাটে বসে থাকে। পুষ্প কাজ করে বেরিয়ে যেতেই আবার দরজাটা লক করে দেয়। তারপর স্নান খাওয়া সেরে অফিসে বেরোয়। এই ছ’ ঘন্টায় একেবারে পাল্টে যায় সায়ন্তন। অফিসের প্রত্যেকটা স্টাফ স্যার বলতে অজ্ঞান। এই চেয়ারটা পাওয়ার জন্যে কম কাঠখড় পোড়াতে হয়নি ওকে। যদিও পকেটে এস সি সার্টিফিকেটটা ছিলো, তবুও… সার্টিফিকেট থাকলেই যে এ চেয়ারে সবাই বসতে পারে তা একেবারেই নয়। মানসিক ও শারীরিক যন্ত্রণা নিয়ে বড়ো হয়ে ওঠা সায়ন্তন বিশ্বাসের কথায় এখন গোটা অফিস চলে। আসলে সায়ন্তন নিজেই জানে না সে নিজে কী চায়। অফিসে ঢোকার পর থেকে চার কাপ র চা আর তিনটে মেরি গোল্ড বিস্কুট খেয়ে দিন কাটিয়ে দেয়। লাঞ্চ বলে ওর ডিকশনারিতে কোনও দিনই কিছু ছিলো না। ছোটবেলায় সুজাতা ভাত খাইয়ে স্কুলে পাঠাতো, তারপর একদিনও টিফিন চেখে দেখেনি সায়ন্তন। টিফিনবক্স খুললেই কেমন বমি পেতো… মনে হতো, আর কিছুক্ষণ পরেই তো রুমকি কাকিমা ওকে স্কুল থেকে নিতে আসবে। তারপর… তার পরের গল্পটা তো সবটাই জানা।

আজ অফিস থেকে ফেরার পথে সাউথ সিটি মলের ফুড কোর্টে একা একা বসে কফি খাচ্ছিলো সায়ন্তন। এই অ্যাম্বিয়েসটা ওর খুব পছন্দের। মাঝেমধ্যে অফিসের স্টাফদের সাথেও দেখা হয়ে যায়। বয়সে ছোট মেয়েদের প্রতি ওর আকর্ষণ জন্মায় না। আর সে কারণেই পার্ট টাইম জবটা ছাড়তে হয় ওকে। বাবা মায়ের প্রচুর সম্পত্তি থাকা গুটিকতক মেয়ে বড়ো হতে না হতে জিগোলো ধরে এনে ঘরে ঢোকায়। কাকুদের বেশি পছন্দ করে এরা। প্রবল মাংসাশী আকর্ষণে আদিম মানুষের সুখ নিতে পছন্দ করে। সায়ন্তন কয়েকবার চেষ্টা করেছিলো, পারেনি! ছোটবেলা থেকে কাকিমা বৌদিদের স্পর্শ ওকে মনের দিক দিয়ে দুর্বল করে দিয়েছিলো। কফি খেতে খেতে হঠাৎ চোখ পড়ে সামনের টেবিলে। মেয়েটাকে বড্ড চেনা লাগছে, কিন্তু কিছুতেই মনে করতে পারছে না আগে কোথায় দেখেছে। ছিপছিপে সুন্দরী তরুণী, বয়ফ্রেন্ডের সঙ্গে এসছে। মেয়েটাকে পেমেন্ট করতে দেখে খানিক অবাক হয় সায়ন্তন। মনে মনে ভাবে, আজকাল তো সব মেয়েই নিজেদের বয়ফ্রেন্ড্ আর হাসব্যান্ডকে এটিএম মনে করে। শিগগিরই আর একটা কফি অর্ডার করতে যায় সায়ন্তন।  
“এক্সকিউজ মি, আপনাকে আগে কোথায় দেখেছি বলুন তো?”
সায়ন্তনকে দেখে মেয়েটা একটু ঘাবড়ে যায়। টাকাটা ফট করে কাউন্টারে ফেলে দিয়ে দৌড়ে চলে যায় ছেলেটির কাছে। তারপর যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ওখান থেকে বেরিয়ে যায়। সায়ন্তনও পিছু নেয়। যত জোরে সম্ভব গাড়ি চালাতে থাকে। বীভৎস জ্যাম পেরিয়ে ওদের গাড়িটা হাইরোডে ওঠে। মুহূর্তের মধ্যে সব শেষ। লরির নিচে পিষে যায় দুজন। চারিদিক থেমে যায়। পুলিশ আসার আগেই সায়ন্তন ওখান থেকে বেরিয়ে যায়। ফিরে এসে আর ড্রেস চেঞ্জ করার সময় পায়নি। ল্যাপটপে ফোল্ডার চেক করে সায়ন্তন। হুবহু এক দেখতে একটা মেয়ের ছবি। সবটা মনে পড়ে সায়ন্তনের। 
“তার মানে সেদিন ওখানে আরও কেউ ছিলো। ঠিক ধরেছি। নইলে পুলিশে কম্পেলেনটা কে করলো! টুইনস… আমার একেও চাই।”
সঙ্গে সঙ্গে গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে গেলো। অ্যাক্সিডেন্ট স্পটে পৌঁছে এক এক করে সবাইকে প্রশ্ন করলো, 
“কীভাবে হলো অ্যাক্সিডেন্টটা? ইস! আজকালকার ছেলেমেয়েগুলো না, সত্যি… এতো তাড়াহুড়ো কীসের কে জানে! মারা গেছে না? কোন হসপিটালে নিয়েছে জানেন কিছু?”
কাছেধারে সবকটা মর্গে খোঁজ নিয়েছে সকাল অবধি। তারপর বাড়ি ফিরে দিব্বি অফিস করেছে সারাটা দিন। গত তিনদিন ধরে খোঁজ করার পর জানা যায় ছেলেমেয়ে দুজন মুসলিম। সায়ন্তন এবার আর শ্মশান না, সমস্ত কবরস্থানে ছানবিন চালাতে থাকে। পাঁচদিন পর অবশেষে হদিস মেলে বাগমারি কবরস্থানে ওদের দুজনকেই কবর দেওয়া হয়েছে। সায়ন্তনের চোখেমুখে সাহসী হাসি। পোড়ানো হলে ও খুব একটা খুশি হতো না। কবর বলেই মনটা চাঙ্গা লাগছে হঠাৎ। সেদিনই রাতের অন্ধকারে কবরস্থানের সামনে গিয়ে দাঁড়ায় সায়ন্তন। এতো রাতে গার্ড কিছুতেই ঢুকতে দিতে চায় না। প্রচণ্ড কান্নায় ভেঙে পড়ে সায়ন্তন। ইতিমধ্যে দুজনের নামও জোগাড় করে ফেলেছে ও।  
” আমার নিজের ভাতিজা। প্লিজ যেতে দিন…”
গার্ডকে পাঁচ হাজার টাকা ঘুষ দিয়ে ঢুকে পড়ে ভেতরে। মাটি কাঁচা থাকলেও সিমেন্ট দিয়ে সবটা লেপা।  
“বডি দুটো আমার চাই। দশ হাজার…”

ফ্ল্যাটে ফিরে এসে সুজাতাকে ওষুধ লাগিয়ে এপাশ ওপাশ ঘুরিয়ে নেয় সায়ন্তন। তারপর গুনগুন করে গান করে, “আয় ঘুম যায় ঘুম বর্গি পাড়া দিয়ে…” সুজাতার মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়। সুজাতার সামনে পর্দা টেনে দিয়ে খাটে ওঠে চটপট। মোবাইলে এক্স এক্স ডট কম চালিয়ে গোটা রাত কাটিয়ে ভোরবেলা ঘুমিয়ে পড়ে নিশ্চিন্তে। সকালে পুষ্প এসে দশবার কলিংবেল টিপেও সায়ন্তনের সাড়া পায়নি। দুপুর সাড়ে বারোটার সময় সায়ন্তন ঘুম থেকে ওঠে, 
“ও শিট! অ অফিস!”
বলেই কল লিস্ট চেক করতে থাকে। 
“কখন আসবে? রাতের দিকেই ভালো হয়। আমি তো ফুল চন্দন নিয়ে তৈরি। না না, আমি আনতে যাবো। আপনি শুধু চারপাশটা দেখে রাখবেন। আর শুনুন… হ্যালো, শুনতে পাচ্ছেন? পরপর এলে আপনার পকেট ভারির দায়িত্ব আমার।”

রান্নাঘরে গিয়ে এক হাড়ি খিচুড়ি বসিয়ে স্নান সেরে নয় সায়ন্তন।  সারাটা বিকেল ল্যাপটপ নিয়ে  কেটে যায়। মাঝেমাঝেব্যালকনিতে আসে দাঁড়িয়ে থাকে। চোখ যায় সামনের অ্যাপার্টমেন্টে। মা বাবা আর তাদের ছোটো বাচ্চাটাকে দেখে ভীষণ লোভ হয় একটা সংসারের। চোখ বুজলে মহুয়ার মুখটা মনে পড়ে। কলেজ পালিয়ে শাহরুখ খানের সিনেমা দেখা, ময়দানে বসে বাদাম ভাজা খাওয়া, হাত ধরে ট্রামে ওঠা, ফিরতে সন্ধে হলে মহুয়াকে বাড়িতে ছেড়ে দিয়ে আসা… সবটাই এখন ইতিহাস। মহুয়া কোথায় আছে কীভাবে আছে সায়ন্তন জানে না। বছর পনেরো হয়ে গেলো কোনও যোগাযোগ নেই দুজনের। কিন্তু সময়টা সময়ের মধ্যে রয়ে গেছে। বৃষ্টি পড়লে আরও বেশি করে মনে পড়ে সে সব দিন…  
“আজ চাউ এনেছি।” 
“তুমি বানিয়েছো?” 
“হ্যাঁ, কেন বানাতে পারি না বুঝি?” 
“ওলে বাবা লে সোনা সোনা… খাইয়ে দাও”

সায়ন্তন মহুয়ার মুখে টূকটুক করে চাউমিন পুরতে থাকে। ময়দানে তখন বিকেল নেমেছে সবে। দু চারটে সাদা ঘোড়া এদিক ওদিক করছে। ওরা দুজন দূর থেকে ভিক্টোরিয়া দেখছে। মহুয়া আস্তে আস্তে বলে ওঠে, 
“ওই একদিন নিয়ে যাবি?” 
“যাবো তো।” 
“আচ্ছা তার আগে তুই আমায় তুমি বলা বন্ধ কর” 
“ভালোবাসি তো, তুই বলা যায় না।” 
“ওওওওও” 
“ওরে আমার পাগলি, এখনও কিছুই বোঝো না তুমি…”
বলে হেসে ফেলে সায়ন্তন। 

তারপর থেকে আর বাগবাজারের দিকে যায়নি। পার্ট-টাইম জবের অফিস ততদিনে দমদম পার্কস্ট্রীট রাজারহাটে ট্রান্সফার হয়েছে। মিস রুবিও মারা গেছেন, ভার পেয়েছিলেন মিসেস বক্সী। পুরোনো কর্মচারী হিসেবে দাম বাড়লেও পরবর্তীতে বয়সের জন্যে দাম কমে যায় সায়ন্তনের। সবচেয়ে অসুবিধার কারণ ছিলো, সবার সামনে আসতেও নারাজ থাকতো সায়ন্তন। ওখানকার বেশিরভাগ ক্লাইন্টই ওর অফিস কলিগদের ওয়াইফ। সায়ন্তন এই পরিস্থিতি আর মেনে নিতে পারছিল না। সব কিছু ছেড়েছুড়ে একার জীবন বেছে নেয় শেষমেশ। 

ঘড়িতে ঠিক রাত এগারোটা। এতটা সময় ধরে অপেক্ষার অবসান এবার। সায়ন্তন গাড়ি নিয়ে সোজা মানিকতলা এসে পৌঁছায়। এখানেই ইমরান আলি লরি নিয়ে অপেক্ষা করছে ওর জন্যে। গাড়িটা দেখতে পেয়েই ইরফান এগিয়ে আসে। কাচ নামিয়ে দেয় সায়ন্তন।
“মেহেবুবের আদমি আছি…” 
“কটা আছে?”
ইমরান আঙুল দিয়ে দুই দেখায়। 
“গাড়িতে ধরবে?” 
“আরামসে…” 
“এখানে না, কোনও ফাঁকা জায়গায়… ফলো মি…”

ক্রমশ…

পাতাবাহার – পর্ব: ৩

Leave a Reply

Your email address will not be published.