পাতাবাহার – পর্ব: ৩

প্রত্যূষা সরকার

“আসতে পারি?” 
“হ্যাঁ আসুন মিস্টার” 
“বিই… শ্বাস, সায়ন্তন বিশ্বাস” 
“আর ইউ নার্ভাস?” 
“ক্ কই, না তো!” 
“ওকে, লেটস্ মিট মিসেস আগরওয়াল… হিয়ার ইস ইওর ক্লাইন্ট।”
সায়ন্তনকে চোখের ইশারায় ওপরে যেতে বললেন মিস রুবি। নর্থ কোলকাতার বেশ কিছু পুরোনো বাড়ি ভেঙে তৈরি অ্যাপার্টমেন্ট তার দখলে। এখানেই চলে বিজনেস। সায়ন্তন বিশ্বাস কর্মসূত্রে জিগোলো। মায়ের অসুখের ভার, সংসারের টানাপোড়েন, পাশাপাশি ইঞ্জিনিয়ারিং… সমস্তটাই ওর রোজগারে। মিস রুবির বয়স পঞ্চাশ ছুঁই ছুঁই। যে সমস্ত হাউজ ওইয়াফ ডিপ্রেশনের শিকার অথবা বিবাহিত জীবনে অতিষ্ঠ, কিংবা যে সমস্ত স্ত্রীদের স্বামীরা শহর বা দেশের বাইরে থাকে এবং যারা দিনের পর দিন স্বামীর সুখ থেকে বঞ্চিত তাদের সুস্থ রাখতেই এই সোসাল সার্ভিস। 

মিসেস আগরওয়ালের পেছন পেছন সায়ন্তন উঠে যায় সিঁড়ি দিয়ে। রুমে ঢুকতেই নাকে ধূপকাঠির গন্ধ। এই গন্ধেই ওর প্রতিদিনের ধান্দার শুরুটা হয়ে থাকে। মিসেস আগরওয়াল ওর থেকে কুড়ি বছরের বড়ো। স্লিভলেস ব্লাউজ আর ফিনফিনে সিফনের কালো রঙের একটা শাড়ি পরে ধপ করে বসে পড়লো নরম খাটটায়। ঘরে লাল আলো জ্বলছে, টেপ রেকর্ডারে ‘আর কতো রাত একা থাকবো…’। সায়ন্তন দরজায় খিল দেয়। মিসেস আগরওয়াল শাড়িটা থাইতে তুলে উঠে পড়ে সায়ন্তনের ওপর। সত্তর কিলো ভারের মহিলা, যদিও সায়ন্তন জানে এদের কীভাবে হ্যান্ডেল করতে হয়।  
“এ বাল, ঠিকঠাক দিতে না পারলে না সব পয়সা বাওপাস। নিচে যে রেন্ডিগুলো বসে আছে, ফিফটিন হানড্রেড দেবে বলছিলো, হামনে তো দো হাজার মে মান গেয়ি।”
সায়ন্তন টেনে খুলতে যায় ব্লাউজটা। 
“ছেড়ো মাত… তুম আরামসে লাগাও… জারা পেয়ার সে… আঃ!”

এ বয়সের মহিলাদের আসলে বাচ্চা ছেলেই পছন্দ বেশি। এরা বেশ তরতাজা। আদর করে সেক্স করতে পারে। ইন্টারকোর্সের মুহূর্তের থেকে বরং আগের কোর্সে ইন্টারেস্ট বেশি। প্রায় পাঁচ বছর টানা রুমকি কাকিমার কামের শিকার হয়েছে সায়ন্তন। পরবর্তীতে যদিও অভ্যেস হয়ে গেছিলো। সেভেন এইটে পড়কালীন বিষয়টাতে যতটা না ট্রমাটাইজড হতো তার থেকে বেশি আগ্রহ আর আরাম পেতো সায়ন্তন। মাধ্যমিক পাশের আগেই রুমকি এখান থেকে পালিয়ে যায়। সায়ন্তনও চারিদিকে পার্ট-টাইমের খোঁজ করতে থাকে। দেখতে শুনতে ভালো ছিলো বলে টালিগঞ্জে হিরো হতে গিয়ে চা বিস্কুট দেওয়ার কাজ পায়। বছরখানেক পর দেবদারু মিত্রের একটা বাংলা ছবিতে দু মিনিটের রোলও জোটে। সেখানেই পরিচয় রস্মি ঘোষের সঙ্গে। রশ্মি ওকে মিস রুবির সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দেয়, তার আগে অবশ্য কয়েকবার বিছানায়ও নিয়েছে সায়ন্তনকে। উচ্চমাধ্যমিকের সাথে সাথে জয়েন্টেও দুর্দান্ত রেজাল্ট, এরপর যাদবপুরে অ্যাডমিশন সায়ন্তনের। পাশাপাশি বাড়তে থাকে পার্ট-টাইমের ধান্দাটা। মহিলাদের সেক্সুয়াল আর্জ যে পুরুষের থেকে কতোটা বেশি আর সাংঘাতিক হতে পারে সেটা সায়ন্তন দশ বছর বয়সেই খুব ভালোভাবে বুঝে গেছিলো। রুমকি কাকিমা ওকে হাতে ধরে টেকনিক শিখিয়েছে। প্রচণ্ড রাগ হলেও মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে একটা শব্দও বের করতে পারেনি ছেলেটা। পুরুষমানুষের কান্না এমনিই দেখা যায় না, তার ওপর একটা ছেলের রেপ হয়েছে শুনলে হাসির খোরাক হওয়াটা এ সমাজে খুব একটা অস্বাভাবিক নয়। 

 “এ বানচোদ, জোরসে অর জোরসে…”
কচকচ শব্দ হচ্ছে খাটে। সায়ন্তন মুখ বাড়িয়ে দেখছে জানলার বাইরেটা। অল্প আলো। সূর্য ডুবছে। এরপর একঘন্টা রেস্ট… তারপর আবার, আবার শুরু আর একটা যুদ্ধ। একদিন অন্তর একদিন এখানে আসে বলে পরপর তিনটে কাস্টমার নেয় সায়ন্তন। ছেলেদের ক্ষেত্রে খুব একটা শারীরিক অসুবিধা হয় না। কিন্তু চোখ বন্ধ করলেই মায়ের মুখটা বারবার মনে পড়ে যায় সায়ন্তনের।  
“মা, শুধু তোমার জন্যেই তো… তোমার জন্যে আমি সব করতে পারি!”

ঘুটঘুটে অন্ধকারের মধ্যে একা একা বসে আছে সায়ন্তন বিশ্বাস। পুরোনো ফ্যাক্টরির আন্ডারগ্রাউন্ডে থাকাকালীন ও অতীতে ফিরে যায়। আর সেখানে ফিরবে বলেই এখানে আসা। 
“আমি মাংস চাই, আরও মাংস…”
ছটফট করতে করতে পাশের ঘরে যায় সায়ন্তন। শিশিটা হাতে নিয়ে এসে তোষকে বসে। তারপর করুণভাবে তাকিয়ে থাকে ব্যাঙ দুটোর দিকে… 
“বন্ধ করে রেখেছি বলে কষ্ট হচ্ছে? আহা রে! তবুও তো কতো ভালো দেখ, একসাথে আছিস। আমি তো আলাদা করিনি তোদের। এ এখানে মরে যাবি। হ্যাঁ মরতে তো হবেই। সবাই মরে যায়। কেউ বাঁচে না। খুব মজা কর। লাফা লাফা, একটু দেখি… কী রে! আঃ খুব টায়ার্ড লাগছে? আদর করিসনি কেন ওকে? এই যে তোকে বলছি। হামি দে দেখি। ও আমার সামনে দিবি না, তাই তো? ঠিক আছে, নে চোখ বন্ধ করলাম। খুলি এবার খুলি? ওয়ান টু থ্রি…”
চোখ খুলেই হাত থেকে ফেলে দেয় শিশিটা। ব্যাঙ দুটো কিলবিল করতে করতে বেরিয়ে পড়ে শিশি থেকে। কাচের টুকরোগুলোর ওপর দিয়ে লাফিয়ে চলে যায় ওরা। সায়ন্তন দেয়ালের দিকে তাকিয়ে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে রুমকি কাকিমাকে… 
“চোখ খুলি এবার? কাকিমা? কোথায় গেলে? খুলছি কিন্তু? ওয়ান টু থ্রি…”
চোখ খুলে দেখে গুদামে ও ছাড়া আর কেউ নেই। এদিক ওদিক ছুটে বেড়ায়। প্রচণ্ড জোরে চিৎকার শুরু করে। হঠাৎ রুমকি এগিয়ে আসে ওর দিকে। অত বড়ো শরীরে কিচ্ছু নেই। খালি গায়ে এসে জাপটে ধরে সায়ন্তনকে।  
“আমাকে এভাবে ধোরো না, সারা গা শিরশির করছে।”
সবে পনেরো পেরিয়েছে সায়ন্তন। রুমকি আরও হিংস্র হয়ে উঠছে ইদানিং। সায়ন্তনকে দেয়ালে ঠেলে উল্টো দিকে ঘুরিয়ে ওর প্যান্ট খুলে নেয়। নিতম্বের ওপর ঠাস ঠাস করে মারতে থাকে। দেয়াল ধরে চেঁচাতে থাকে সায়ন্তন। 

হুট করে মনে হয় যেন তোষকের ওপর টাকার বান্ডিল পড়লো।  
“আমি টাকা নিই না, ম্যাডামকে দিন।”
পরপর মহিলাদের কন্ঠস্বর ভেসে আসে ওর কানে 
“এটা শুধু তোমাকে দিলাম। মিস রুবির কাছে মাইনে পাবে। এটা তোমার জন্য। এতো খুশি আমি… হা হা হা”
চারিদিক থেকে এক একটা গলার আওয়াজ। কান মাথা ছিঁড়ে পড়ছে সায়ন্তনের। 
“নাঃ! আমি সব ছেড়ে দেবো… সব ছেড়ে দেবো আমি!”

ভোর হতে না হতে গাড়ি নিয়ে ফ্ল্যাটে চলে আসে সায়ন্তন। বেডরুমের দরজা খুলেই মাকে গিয়ে জড়িয়ে ধরে। 
“মা এই দেখো, ওষুধ এনেছি তোমার জন্যে। হ্যাঁ গো… সোনা মা আমার।”
হঠাৎ কলিং বেল বাজতেই ঘাবড়ে যায়। ওষুধগুলো মেঝেতে ফেলে দৌড়ে এসে দরজা খোলে। পুষ্প বিনুনি দোলাতে দোলাতে ঢোকে। 
“সরেন সরেন… উফ!”
সাত তাড়াতাড়ি গিয়ে বেডরুমের দরজাটা বন্ধ করে সায়ন্তন। পুষ্প ঝাঁটা হাতে নিয়ে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে। বিষয়টা প্রথম দিন থেকেই লক্ষ্য করছে ও। 
“কী যে হাতি-ঘোরা আছে ঘরের ভেতর কে জানে বাবা!”
সায়ন্তন কোনও কথা না বলে ঠাঁয় বসে থাকে ড্রয়িং রুমে। পুষ্প চুপচাপ কাজ করে চলে। সারা রাত ঘুম না আসায় একটু ঝিম আসে। সোফাতেই মাথা এলিয়ে দেয়। 
“স্যার…” 
“হুম, হুম…”
চোখ খুলতেই দেখে পুষ্প হাত বাড়িয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে ওর সামনে। 
“কী? কী হল!” 
“বাজার যাবো। টাকাটা…”
সায়ন্তন আড়মোড়া ভেঙে হাফপ্যান্টের পকেট থাবায়।  
“দাঁড়া”
বলে ঘরে ঢোকে। পুষ্প উঁকি মারতে থাকে ওর ঘরে। ঘর থেকে বেরিয়ে আবার দরজাটা লক করে দেয়। পার্স থেকে টাকা বের করতে করতে বলে, 
“পুষ্পরানি এতো আগ্রহ ভালো নয় বাবা… যাও বাজারে যাও।”
পুষ্প ঘাড় নেড়ে বেরিয়ে যায়। সায়ন্তন চোরের মতো নিজের ঘরে ঢোকে আবার। মেঝে থেকে ওষুধগুলো নিয়ে আলমারিতে তুলে রাখে। 
“কী ভাবছো? ও মা? ধ্যাৎ! ওই পুষ্পটা… হেব্বি ইন্টারেস্ট। কী করছি, কী না করছি। আমি অত কথা বলবো কেন হ্যাঁ? শোনো না…”
বলে বাঁ হাতটা সুজাতার মুখে রাখে 
“রিঙ্কেলস বেড়েছে কিন্তু। না না কোনও কথা শুনবে না। আজ ক্রিম লাগাতেই হবে।”
বলেই আয়নার সামনে আসে। ক্রিম খুঁজতে খুঁজতে চোখ পড়ে নিজের মুখ। সারাটা মুখে হাত ঘষে। তারপর নিজেই নিজের গালে ক্রিম লাগাতে থাকে। আবার কলিংবেলের শব্দ। পুষ্প বাজার সেরে এসে গেছে। ঘর বন্ধ করে বাইরের দরজা খুলে দেয় সায়ন্তন। তারপর ব্যাগ খুলে এটা ওটা ঘাটতে থাকে, 
“কী হলো? কিছু খুঁজছেন?” 
“না মানে, কী খাবো আজ?” 
“ওই তো পালং শাক আর বরবটি দিয়ে কাতলা মাছ।” 
“কেন, মাংস আনিসনি?” 
“মাংস?” 
“হ্যাঁ, আজ তো শনিবার।”
সায়ন্তনের কথা শুনে জোরে জোরে হাসতে থাকে পুষ্প। 
“সে শনি হোক বা রবি, আপনি কোন্ দিন আলাদা করে মাংস খান? ও তো রোজই খান।”
পুষ্পর কথা শুনে দৌড়ে গিয়ে ওর মুখের কাছে মুখ নেয়। চোখ দিয়ে তখন আগুন বেরোচ্ছে। জিভে রাক্ষসের খিদে। 
“হ্যাঁ, খাই তো। আমার মাংস লাগবে মাংস।”
পুষ্প নড়েচড়ে ওঠে। এরকম অকওয়ার্ড বিহেভিয়ার ও আগে কখনও পায়নি। পুষ্পর গলা শুকিয়ে এসছে তখন, 
“বলছিলাম যে, মাংস তো আপনি আনেন। আমার আনা বা রান্না কোনওটাই তো খান না!”
সায়ন্তনের সম্বিত ফেরে। একটু দূরে গিয়ে বলে, 
“তাড়াতাড়ি কাজ শেষ কর। আমাকে বেরোতে হবে।”

ডাইনিং টেবিল থেকে ফোনটা হাতে নিয়ে সুইচ অন করে সায়ন্তন। গতকাল বিকেল থেকে একটানা সুইচড অফ ফোনটা। একটু আড়ালে গিয়ে নম্বর ডায়েল করে, 
“পাওয়া যাবে? কোনও রোগ ছিলো না তো? আরে যা হোক দিন তো, হিজরে হলেও ক্ষতি নেই। আসছি আসছি…”

ক্রমশ…

পাতাবাহার – পর্ব: ২

One thought on “পাতাবাহার – পর্ব: ৩”

Leave a Reply

Your email address will not be published.