পাতাবাহার – পর্ব: ২

প্রত্যূষা সরকার

কংক্রিটের শহরে সায়ন্তন অক্সিজেনের অভাব বোধ করে। অত বড়ো একটা ফ্ল্যাটে একার অগোছালো সংসার। শুধুমাত্র শুক্রবার ফ্ল্যাটের বাইরে রাত কাটায়। ওই দিন অফিস ছুটির পর অফিসের গাড়িতেই ফ্ল্যাটে আসে। তারপর পার্সোনাল কার নিয়ে চলে যায় শহর থেকে একটু দূরে, মোটামুটি ঘন্টা খানেকের জার্নি ওখান থেকে… একটা স্বল্প বসতির গাছপালা ঘেরা পুরোনো কারখানায়। ছোটোবেলায় রুমকি কাকিমার সাথে গাড়ি করে কয়েকবার এখানে এসেছে। কারখানা এখন সম্পূর্ণ বন্ধ। আগে এখানে ইনার গারমেন্ট তৈরি হতো। কারখানা বন্ধ হওয়ার পর এলাকাটাও বসতিহীন বললেই চলে। ভয়ে এখানে কারোর পা পড়ে না। আশেপাশের এলাকার মানুষজন বলে, এখানে অতৃপ্ত আত্মা থাকে। এই তো, দুদিন আগের ঘটনা, দুজন অল্পবয়সী ছেলেমেয়ে বাইকে ঘুরতে এসেছিলো। আর খোঁজ পাওয়া যায়নি তারপর থেকে। পুলিশ এসেও কিছু করতে পারেনি। চারিদিকে ঘন অন্ধকার। গাছের ছায়া আকাশ আর মাটির দূরত্ব এঁকে দিয়েছে বেমালুম। অথচ এখানকার প্রত্যেকটা ফাঁকফোকর সায়ন্তনের পরিচিত। গাড়িটা নিয়ে সোজা ঢুকে পরে জঙ্গলের ভেতর। কোথা দিয়ে কীভাবে বড়ো গাড়ি ঢোকে সবটাই ওর জানা। তালাটা খুলে কারখানার ভেতর ঢুকিয়ে দিলো গাড়িটা। তারপর মেঝে থেকে ধুলো মাখা কার্পেট সরাতেই বেরিয়ে এলো সুরঙ্গ। মোবাইলে টর্চ জ্বালিয়ে সিঁড়ি দিয়ে সোজা নিচে। ওখানে সায়ন্তনের আর একটা সংসার। বেডরুম, বাথরুম, কিচেন সবটা আছে। তোষকের তলা থেকে ঝাঁটাটা বের করে পরিষ্কার করে নিলো গোটা ঘর। বর্ষায় দুটো ছোটো ছোটো ব্যাঙ ঢুকেছিলো ড্রেন দিয়ে। হাতে নিয়ে কাচের বয়ামে সরিয়ে রাখলো ওদের। এই অবস্থায় ফোনে নেটওয়ার্ক কখনোই পাওয়া সম্ভব নয়… সমস্ত সিস্টেমের বাইরে গিয়ে এখানে ওর একার সাম্রাজ্য। আলমারি থেকে দু একটা ওষুধের শিশি বের করে পাশের ঘরে গেলো সায়ন্তন। এ ঘরে আগে ডিসপুট আন্ডার গার্মেন্ট স্টক করা হতো। ও যখন কলেজে ভর্তি হল তখন কলেজের পাশাপাশি একটা নতুন চাকরি জয়েন করেছিলো। তখন থেকে প্রায় কুড়ি বছর ও আর এখানে আসেনি। অফিস জয়েন করার পর আগের চাকরিটা ছাড়তে পারেনি সায়ন্তন। পার্ট টাইম কাজ করতো রাতের বেলা। তবে তিন চার বছর হয়েছে সেখান থেকে সম্পূর্ণ ছুটি পেয়েছে। আস্তে আস্তে শরীরে জোর কমছে। যদিও এতো বড়ো একটা পোস্টে থাকার পর আর পার্টটাইম কাজের দরকার ছিলো না আর্থিকভাবে তবে শারীরিক ও মানসিকভাবে ছিলো। 

ঘরটায় ঢুকতেই বড়ো একটা নিঃশ্বাস নিলো সায়ন্তন। দেয়ালের কাছে এগিয়ে গেলো। এখানে কোনও জানলা নেই। বড্ড স্যাঁতসেঁতে। ভেতরে গিয়ে কয়লার উনুনটা ধরিয়ে মাংস কাটতে থাকলো। আপাতত এখানে মাংসের স্টোর রুম। সারা সপ্তাহের কাবাবের মাংস এখান থেকেই আসে। সায়ন্তন ছাড়া এই সুরঙ্গের হদিস আর কেউ জানে না।

প্রথম যেদিন এখানে এসেছিল সায়ন্তন, একটু অবাক হয়েছিলো। তখন অনেকটা ছোটো ও। রুমকি কাকিমা ভর দুপুরবেলা স্কুল শেষে ওকে এখানে নিয়ে এসেছালো। সিঁড়ি দিয়ে নেমে এসে দেখে অন্ধকার দু তিনটে ঘর, সঙ্গে বাথরুমও আছে। গাদা খানেক অন্তর্বাস ডাই করে রাখা আছে খাপছাড়া ভাবে।  
“এগুলো কী কাকিমা?” 
“জামাকাপড়। তুমি পড়বে?”
সায়ন্তন ডাই থেকে একটা ব্রা তুলে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে। তারপর ঢোক গিলে বলে, 
“না না ইস! এগুলো মা পড়ে।” 
“হা হা হা… মা পড়ে!”
রুমকির মুখে পিশাচের হাসি। সায়ন্তন প্রচণ্ড ভয় পেয়ে রুমকিকে জড়িয়ে ধরে।  
“ওলে বাবা লে, সোনাটা।” 
“আমার খুব ভয় করছে কাকিমা” 
“এই তো ভয় নেই, চল একটা খেলা খেলি…” 
“অন্ধকারে? ভয় আছে ওখানে যাবো না।” 
“উফ! বাবা কোত্থাও ভয় নেই। অন্ধকারেই তো খেলতে হয়।” 
“আমি বাড়ি যাবো।” 
“যাবো তো, আমরা দুজনেই বড়ি যাবো সন্তু। চল আমরা লুকোচুরি খেলি।” 
“আমার খিদে পেয়েছে।” 
“ও সিট! কী করে এতো খিদে পায় বোকাচোদা!”
রুমকির গলার আওয়াজে কেঁদে ফেলে সায়ন্তন।  
“বাড়ি যাবো” 
“যাবি তো, আগে খেলে নি। বোকা ছেলে কাঁদতে আছে! আইসক্রিম খাওয়াবো।” 
“চকলেট আইসক্রিম?” 
“হ্যাঁ বাল চকলেট চকলেট।”
বলতে বলতে হাঁটু গেড়ে নিচে বসে সায়ন্তনের ঠোঁট কামড়ে ধরে রুমকি। সায়ন্তন ওর পিঠে হাত ছুঁড়তে থাকে। নিশ্বাস বন্ধ হয়ে আসতে থাকে ক্রমশ। রুমকি হঠাৎ লক্ষ্য করে সায়ন্তন সাড়া দিচ্ছে না। হাত পা ছুঁড়ছে না। ওর ঠোঁট থেকে দাঁত সরিয়ে দেখে সায়ন্তন জ্ঞান হারিয়েছে। বুকে কান পেতে বুঝতে পারে প্রাণ আছে। আস্তে আস্তে ওর প্যান্ট খুলে পেনিসটাকে চুষতে থাকে রুমকি। খানিকক্ষণের মধ্যে সায়ন্তনের জ্ঞান ফিরে আসে। চোখ খুলে ক্লান্ত গলায় বলতে থাকে, 
“বা আ ড়ি যাবো… লাগছে!”
রুমকি চটপট ওর প্যান্টের চেন আটকে দেয়। তারপর ওকে কোলে নিয়ে সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠে ওখান থেকে বেরিয়ে আসে। ওটা রুমকির হাসব্যান্ডের ফ্যাক্টরি। অতএব ওখানে কেউ প্রশ্ন করার নেই ওকে। যদিও সেদিন খুব একটা লোকজন ছিলো না। বাচ্চা ছেলে কাকিমার কোলে ঘুমিয়ে পড়েছে ভেবে কেউ আর কিছু সন্দেহও করেনি। গাড়িতে উঠে সোজা বাড়ি আসে দুজন।  
“সুজাতা, তোমার ছেলেটা না সত্যি! কতবার বললাম, তোর মার দেরি হবে চল আর একটু ঘুরি, শুনলেই না। দেখো কেমন কেতরে গেছে।” 
সুজাতা ছেলের ঠোঁট দেখে একটু ঘাবড়ে যায়। সায়ন্তনের ঠোঁটে হাত দিতেই রুমকি বলতে শুরু করে, 
“উফ! কী দুরন্ত গো… কতবার বলেছি মারামারি করিস না, একটা কথাও শুনলো না। এই ছেলেকে কী করে সামলাও তুমি! মারামারি করছিলো বন্ধুদের সাথে।”
বলতে বলতে সায়ন্তনের দিকে তাকিয়ে চোখ পাকায় রুমকি। গাড়িতে আসতে আসতে ফিসফিসিয়ে ওর কানে কানে বলা কথাগুলো মনে পড়ে যায় সায়ন্তনের। 
“তোর মা যদি এই খেলাটার ব্যাপারে জানতে পারে, মা কিন্তু মরে যাবে। তখন তোর আর কেউ থাকবে না… কী হবে তখন?” 
“কাকিমা, এখানে ব্যথা করছে।” 
“কিচ্ছু হয়নি সোনা। বলবি বল খেলতে গিয়ে নিচে লেগেছে। কেমন?” 
“কখন লাগলো?” 
“ওই যে তুই ভয় পেয়ে জড়িয়ে ধরলি, অজ্ঞান হয়ে গেলি হঠাৎ। ঘুমের ঘোরে বলছিলি তো হিসু পেয়েছে। চেপে রেখেছিলি তো, তাই বোধহয় ব্যথা।” 
“কিন্তু কাকিমা…” 
“আর কোনও কিন্তু নয়। চুপ চুপ। কিচ্ছু হয়নি। কী শেখালাম মনে আছে তো?”
ভাবতে ভাবতে অসাড়ের মতো ঘরে চলে গেলো সায়ন্তন। সুজাতা রাতেরবেলা ঠোঁটে ওষুধ লাগিয়ে দেওয়ার সময় ওকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে থাকে সায়ন্তন।  
“আর যেন না শুনি মারপিট করেছিস। রুমকি কিন্তু খুব রেগে গেছে আজকে। ওর কথা মতো চলবি। পরিষ্কার বলে দিলাম। এরপর কথা না শুনলে সোজা হোস্টেল।”

মাংস পোড়ানো শেষ করে তোষকে এসে বসে সায়ন্তন। গলার ভেতর রাম ঢেলে সাত পিস মাংস এক এক করে মুখে পুরে নেয়। 
“আঃ! শান্তি…”
খানিকক্ষণ শুয়ে আবার উঠে পড়ে। পাশের ঘরে গিয়ে এদিক ওদিক তাকায়। তারপর ফোন কানে দেয়… 
“হ্যালো মা… হ্যাঁ খেয়েছি… না গো সব শেষ। আবার বেরোতে হবে। কিন্তু কোথায় পাবো। এখন তো পার্ট টাইম জবটাও নেই! কী যে বলো! বয়সটা দেখবে তো… না অতো কৈফিয়তের কী আছে। আমার খিদে পাচ্ছে আবার। দেখি চর্বি টর্বি কিছু থাকলে ওই দিয়েই চালিয়ে নেবো… আচ্ছা তুমি চিন্তা কোরো না। ফোন রাখো। আরে রাখো না… ধ্যাৎ!”
মেঝেতে বসে ঝুড়িতে ফেলে রাখা উচ্ছিষ্ট মাংসের চর্বি পুড়িয়ে বিছানায় নিয়ে আসে সায়ন্তন। খেয়েদেয়ে ডান পাশ ফিরে শোয়ে। হাত মুছে নেয় তোষকেই। প্রচণ্ড গরমে জামাকাপড় খুলে নেয়। এই অদ্ভুত গরমটা ওর ভালো লাগে বলেই এখানে একা একা আসে। ইলেকট্রিসিটি নেই, মোববাতির আলোই ভরসা। যে কোনও সুস্থ মানুষ এখানে এক মিনিট টিকতে পারবে না। অথচ শুক্রবার সন্ধে থেকে শনিবার দুপুর অবধি সায়ন্তন এখানেই থাকে। রাতবিরেতে মাকড়সাদের সাথে গল্প করে। তারপর জামাকাপড় খুলে ম্যাস্টারবেট করতে করতে ঘুমিয়ে পড়ে। 

পার্ট টাইম জবটা ছাড়ার পরেই সায়ন্তন এই হ্যালুসিনেশনটাকে বন্ধু করে নেয়। বছর কুড়ি আগে যখন কলেজে পড়তো তখন একমাত্র বন্ধু বলতে মহুয়া। ফার্স্ট ইয়ারে যেদিন প্রথম আলাপ, সেদিন সায়ন্তনের জন্মদিন ছিলো। ফর্সা লম্বা আর চোখের নিচে একটা কাটা দাগ সায়ন্তনের। মেয়েরা প্রেমে হাবুডুবু খেলেও সায়ন্তন কাউকে পাত্তা দেয়নি কোনও দিনই। অথচ মহুয়ার প্রতি দুর্বল হয়ে পড়ছিলো দিনের পর দিন। সেদিন কলেজ শেষে নর্থ কলকাতায় মিটিং ছিলো সায়ন্তনের। বড়ো রাস্তায় উঠে ট্যাক্সি দাঁড় করাতেই ওর আগে মহুয়া উঠে পড়লো ট্যাক্সিতে।  
“আয়… তাকিয়ে দেখছিস কী! তুই বাগবাজার যাবি শুনেই তো উঠে পড়লাম।” 
“ও! তোর, তোমার বাড়ি ওখানে?” 
“আরে তুই বল্। একই ক্লাসে পড়ি তো। দেখিসনি আমায়?”
সায়ন্তন মুচকি হাসে। মহুয়া ওর মুখের দিকে তাকিয়ে হেসে ফেলে।  
“তুই কি পুজোটুজো করিস?” 
“কেন?” 
“না মানে, আমি নাস্তিক।”
সায়ন্তন বুঝতে পারে না হঠাৎ এমন প্রশ্নের কারণ। মহুয়া কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে জিজ্ঞেস করে, 
“তিলক কেটেছিস কেন?” 
“তিলক? কো কো কোথায়?”
নিজের কপালে হাত দেয় সায়ন্তন।  
“ও, এটা চন্দন। মা পরিয়ে দিয়েছে।” 
“অ! মাম্মাস বয়।” 
“এই না না, আজ তো…” 
“আজ কী?” 
“আমার জন্মদিন।”
বলে রুমাল দিয়ে মুছে ফেলে তিলকটা।  
“আরে মুছলি কেন! উফ…” 
“না, মানে মুছতে হতো।” 
“তোর বাড়ি এদিকেই?” 
“না, না তো… এ এখানে দাঁড়ান”
বলে তাড়াতাড়ি ট্যাক্সি থেকে নেমে ভাড়া মিটিয়ে পেছন ঘুরলো সায়ন্তন। মহুয়া কাচের জানলা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে বললো, 
“হ্যাপি বার্থ ডে, হ্যান্ডসাম… গিফ্টটা ডিউ রইলো।”

ক্রমশ…

পাতাবাহার – পর্ব ১

2 thoughts on “পাতাবাহার – পর্ব: ২”

  1. নূতন অধ্যায় চাই।এই পর্বের উপন্যাস আগেই পড়েছি।

Leave a Reply

Your email address will not be published.