সাহিত্যCafe – গল্প

গিনিপিগ
বেবী সাউ

ভ্যাপসা হয়ে আছে। কেমন একটা শ্বাসরোধী হাওয়া চলাফেরা করছে ঘরের মধ্যে। মুখগুলো ঝুলে পড়েছে চোখের উপর। থমথম করছে যেন। ঝড়ের আগের অবস্থার মতো। কিন্তু আশ্চর্য নীরবতা। গুমোট একটা গন্ধ । মনে হচ্ছে, অজস্র শিকারীর মধ্যে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে একটি শিকারকে। বুঝতে পারছে এখনই মৃত্যু এসে থাবা বসাবে তার ঘাড়ে, কিন্তু আসছে না। ন্যাশনাল জিওগ্রাফি চ্যানেলের ক্ষুধার্ত শ্বাপদের মাঝে একটা নিরীহ হরিণ শিশু। ওই যে একটা ভয়মিশ্রিত, হত্যাকারীদের গন্ধ– ঠিক সেরকম লাগছে। স্তব্ধ। নিঃশব্দ। সামান্য ভয় করছে। কেউ কিছু বলছে না কেন? তবে কি এই নীরবতাও একটা ভাষা?  মানুষ ক্রমশ কথা হারিয়ে ফেলছে! নাকি শব্দের প্রয়োজন পড়ছে না আর! কী শান্ত হয়ে গেছে চারপাশটি! কী নির্মল! নিজেকে বহুদিন পর ভালো লাগছে। অপার শান্তি। কিছুদিন আগে যখন শব্দ- পলিউশন নিয়ে ওদের মাথায় বিভিন্ন ভাবনা কাজ করছিল– কই তখন তো এসব কথা মনে আসেনি! ভাবনাতেও ধরা দেয়নি– সবচেয়ে বেশি শব্দ ব্যবহার  করে মানুষেরাই। ওরা শুধু পড়েছিল মাইকের চিৎকার, গাড়ির হর্ণ, ফ্যাক্টরির আওয়াজ, মেঘ-ঝড়- বজ্রপাত ইত্যাদির পেছনে। কিন্তু আজ সে বুঝতে পারছে ফেরিওয়ালা, হকার, সব্জী বিক্রেতা,  সেলসম্যান, নেতা, শিল্পী– এরাই বেশি শব্দ ব্যবহার করে। মানে মানুষেরাই। পশু পাখি কীট পতঙ্গ এরা শান্ত। খুব শান্ত। অজস্র কথা তাদের। ভালো-মন্দ, দুঃখ-সুখ, অভিযোগ-অভিমান সবেতেই শব্দের বহুল ব্যবহার। দিনরাত সবাই শুধু চিৎকার করে যাচ্ছে। অভাব অভিযোগে ভরে যাচ্ছে শহরটা। আর বলাই বাহুল্য , মানুষের জন্যই বেড়ে যাচ্ছে সাউন্ড পলিউশন। বাকি বন্ধুদের এই কথাটা বোঝাতে হবে। এটা একটি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট। আর এটাই হবে সাউন্ড পলিউশানের জন্য ওদের নেক্সট মিশন। যদি ইশারাতেই এত কথা বলে ফেলা যায়, তবে কী দরকার এত শব্দের- চিৎকারের। এই যে ঝুঁকে থাকা মুখগুলো তাকে দেখছে, কোনও শব্দ উচ্চারণ করছে না কেউ– অথচ সে স্পষ্ট বুঝতে পারছে তাদের বিস্ময়, ঘৃণা, ভয় জড়িত অবস্থানটিকে– আর এতে তো তার কোনও অসুবিধে হচ্ছে না। বরং ভালোই লাগছে। সবার চোখগুলো দেখে নিজের কল্পনার দুনিয়াটিকে বেশ ডেভেলপ করতে পারছে সে। যখন চার্লি চ্যাপলিন দেখত, এরকম একটা অনুভব তার মধ্যে কাজ করত। আজ এতদিন পরে আবার সমস্ত পৃথিবীটাকে চ্যাপলিন-দুনিয়া লাগছে। হেব্বি লাগছে কিন্তু। এই বিষয়টি নিয়ে দারুণ একটা কাজ করা যেতে পারে। একটা শর্ট ফিল্ম বানালে কেমন হয়? তার এই বর্তমান অবস্থাটিকে নিয়ে! এই ঝুলে থাকা চোখের দৃষ্টিগুলিকে ক্যামেরাতে ফুটিয়ে তুলতে পারলে– উফ! যা দাঁড়াবে না! খোঁজ নিতে হবে, এসব কাজে কত খরচ! সত্যি মাইরি! এই ঝুলে পড়া চোখগুলো তাকে অনেক থট দিচ্ছে। একটা কিছু তো করতেই হবে। আপাতত শর্টফিল্ম আর দূষণের ব্যাপারটা মাথায় এসেছে। ভাব অংশু! ভাব্! এসে যাবে আরও কিছু। এইযে দত্তকাকু বিস্ময়ে হাঁ হয়ে, ওকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছেন; উৎপলদা তাকে দেখে অবাক হয়েছে ঠিকই কিন্তু অবস্থার সমস্যা খুঁজছে, গোয়েন্দা বুদ্ধি  আর মিলিটারী মেজাজ সম্পূর্ণ রেখে– বেশ তো বোঝা যাচ্ছে। হাসি পাচ্ছে অংশুর। সবাই কিন্তু বেশ চমকে গেছে তার এই অবস্থা দেখে। এটাই হতে পারে শব্দ পলিউশানের বিরুদ্ধে প্রচারের মোক্ষম থট। হেডলাইন হবে—“নীরবে কথা বলুন”। বাঃ! দারুণ আইডিয়া তো। যেকথা গুলো মানুষ কখনও ভাষাতে ধরতে পারে না, তখন এরকম নীরবতাই আশ্রয় হতে পারে! নীরব থেকেও এত কিছু প্রকাশ করা যায়! অংশু এই প্রথম রিয়েলাইজ করল। আর অনুভবের মধ্যে ব্যাপারটিকে আনতে পেরে অংশুর এখন বেশ লাগছে। রিয়া-ই তবে ঠিকঠাক ব্যাপারটা বুঝতে পেরেছিল। তাই হবে। রিয়া মাঝেমধ্যে এরকম নীরব হয়ে থাকত। স্পীচলেস। যখনই অংশু চিৎকার করে, হাত পা নেড়ে কিছু অধিকার অথবা ওর দাসত্ব স্বীকার করতে বলত তখনই রিয়া এই মৌনতা অবলম্বন করত। আশ্চর্য দমবন্ধ করা এক অবস্থার সৃষ্টি হত তখন। এক পক্ষ চিৎকার করে পৃথিবীর সমস্ত অভিযোগ দায়ের করে যাচ্ছে অথচ অন্যপক্ষ পুরোপুরি চুপ।

— তোর কী আমাকে নিয়ে সমস্যা হচ্ছে? বল, আজকেই আমাকে জানতে হবে।

–রিয়া চুপ।

— চুপ থেকে তো লাভ নেই। কোনও একটা সলিউশানে পৌঁছাতেই হবে আমাদের।

—তবুও রিয়া চুপ। অংশুর মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। যেন চাইছে অংশু পড়ে নিক না-বলা কথাগুলো। অনেক কথা বলতে চাইছি, কিন্তু বলার প্রয়োজন নেই– এমন একটা ভাব।

—তুই কি কিছু বলবি? নাকি বোবা হয়ে থাকবি? উফ! অসহ্য!

   তখন তো আর অংশু এই নীরবতার ভাষাটিকে ভেবে দেখে নি। মাথায় আসেই নি। কিংবা হয়ত পাত্তাই দেয়নি। ধূস! বড্ড ভুল হয়ে গেছে! কিন্তু এখন এই নীরবতার ভাষাটিকে তার খুব ভালো লাগছে। রিয়া চমকে যাবে নিশ্চয়ই। যখন দেখবে এখন থেকে সেও বুঝতে পারে এই ভাষা, নিঃস্তব্ধতার ভাষা, নৈঃশব্দ, পড়তে পারে চোখ; না-বলা কথাদের।

  তখন কিন্তু টেবিলের ওপর জোরে জোরে হাত পেটাচ্ছে অংশু। রেস্টুরেন্টের ছেলেটি একবার ওদের টেবিলের কাছে এসে ঘুরে গেল। চোখে একটা বাঁকা, ক্রোধী চাউনি নিয়ে। কিন্তু মুখে কিছু বলল না। অংশু স্পষ্ট বুঝতে পারছিল– এটা নিষেধ এবং বিরক্তির মিশ্রিত একটা যুগপৎ ভাষা। ব্যকরণে কী বলে যেন– মিশ্রভাষা। হ্যাঁ, মিক্সড ল্যাংগুয়েজ। তাছাড়া ওই একটা সামান্য  হোটেল বয়ের কাছে বকুনি খেতে ওর বাধত।  তাই সে কিছুটা সংযত করেছিল নিজেকে। কিন্তু রিয়ার সামান্য ভ্রু কোঁচকানো ছাড়া আর কিছু ভাষা ধরতে পারেনি সে। রিয়াকে তার বরাবরই খুব রিজার্ভ লাগে। রিয়া এত কম শব্দ ব্যবহার করে বলেই কি অংশুর এমন লাগে? হতে পারে। তাছাড়া, এত মন দিয়ে, অনুভব দিয়ে তো সে কখনও রিয়াকে বোঝেনি। তাই হয়ত কখনও রিয়াকে বুঝতে পারেনা সে। ওর মনে যে কখন কী চলে— অংশুর বোধের বাইরে। অংশু বুঝতে পারত এই নীরবতা এবং শব্দহীনতার জন্যই রিয়া ছিল তার কাছে অধরা। কিন্তু আজ তো তার কোনও প্রব্লেম হচ্ছে না। বেশ বুঝতে পারছে এই নৈঃশব্দের দুনিয়াকে। বরং বেশ ভালো লাগছে। কিন্তু রিয়ার সঙ্গে এই নীরব এবং শব্দের দ্বন্দ্বে অংশু স্তিমিত হয়ে আসত। চুপ করে যেত। সমস্ত অভিযোগ, শোকেরও শেষ আছে তবে। তারপর রিয়া চুপচাপ উঠে চলে যেত। কিছুতেই অংশু আর অবস্থাকে সামাল দিতে পারত না। আজকেও কি অংশু সামাল দিতে পারবে না?  ঝুঁকে থাকা মুখগুলি ধীরে ধীরে কি একটু হলেও সোজা হচ্ছে? উঠে দাঁড়াবে? এই মুখগুলির অনেককেই অংশু চেনে। তার শৈশব থেকে জড়িয়ে থাকা মুখগুলো। কৈশোরেও এদের কাছে ঘুরেছে। সবাই পরিচিত। শুধু একজন! উনি কে? অংশু কি আগে কখনও দেখেছে?  মনে পড়ছে না তো! মেমোরি কি তবে আর সঙ্গ  দিচ্ছে না?  কিন্তু অংশুকে ট্যাবলেট দেওয়া ভদ্রলোকটি তো এরকম কিছু বলেননি। শুধু বলেছিলেন –“পরিবর্তনটি হবে বাইরে। কিন্তু আপনার চিন্তা ভাবনা— অন্তঃস্থলে আপনি যেমন ওরকমই থাকবেন”। অংশু এই ভদ্রলোকের খোঁজ পায় পত্রিকার বিজ্ঞাপন থেকে। বিবস্বান চক্রবর্তী। প্রথমে চোখে পড়েনি। বেশ ভালোই লাগে তার বিজ্ঞাপনের ক্রোড়পত্রটি। সমাধানের জন্য হুমড়ি খাওয়া মুখগুলিকে আবিষ্কার করতে পারত বিজ্ঞাপনের ছাপা অক্ষরগুলি থেকে। কেমন একটা রহস্য রহস্য গন্ধ থাকে প্রতিটি বিজ্ঞাপনে। হঠাৎ করে সব পেয়েছির আশায় যেন অপেক্ষা করছেন কালো কালো অক্ষর গুলি। পাত্র-পাত্রীর বিজ্ঞাপন, টিউশন টিচারের বিজ্ঞাপন, আয়া, নার্সিংহোম,  জ্যোতিষী ইত্যাদির ভিড়ে ছোট্ট করে লেখা ছিল–” পরিবর্তন চান? দু’ঘন্টার মধ্যেই…” সঙ্গে একটা ফোন নং। কৌতুহল নিয়ে অংশু ফোন করে। অবশ্য ফোনে কথা বলে লোকটাকে পাগল ছাড়া কিছু মনে হয়নি। কিন্তু পরে অংশুর মনেও ধারণা দৃঢ় হয়। গিয়ে দেখা করে। তারপরেও দোটানায় ভোগে অংশু। বারবার মায়ের কথা ভাবে, রিয়ার কথা ভাবে। অবশেষে ডিসিশনটা নিয়েই ফেলে। ওষুধের প্যাকেটটিও তাকে সম্মোহনের মতো টানতে থাকে। আর আজ অবশেষে আসে সেই মোক্ষম সময়। মা কলেজে বেরোনোর আধঘন্টা আগে ওষুধটি খায় সে। তখন কিছু মনে হয়নি। কিন্তু কেমন একটা ঝিম ঝিম ভাব আসছিল। নেশা নেশা। চুপচাপ শুয়ে পড়ে। আচ্ছা, মা কি বেরোনোর সময় তাকে কিছু বলছিল? মনে পড়ছে না তো! কেমন একটা তন্দ্রার মতো ভাব এসে গেছিল তখন। তারপর অংশুর আর কিছু মনে নেই। চোখ খুলে দেখে তার উপর অসংখ্য চোখ ঝুলে আছে। বিস্ময় মাখা চোখ। ঝুলে থাকা চোখ। মৃত অথচ তীক্ষ্ণ চোখ। যেন, এই চোখেরা কখনোই তাকে এরকম ভাবে দেখতে চায়নি; কিংবা ওদের দৃশ্যের জগতের সঙ্গে অংশুর এই পরিবর্তনের জগত বড্ড বেমানান। বরং যদি অংশু আত্মহত্যা করত তাও সবাই সঠিক বলে মেনে নিত। অথচ, সবাই পরিবর্তন চাইছে। সবাই চাইছে দেশের পরিবর্তন হোক। দশের পরিবর্তন হোক। চারপাশে বেরোলেই তো হাজার হাজার পোস্টার। পদ্ম টিপে দেশ পাল্টান, ফুলে টিপুন, হাতে রাখুন আঙুল। পরিবর্তনের জন্য কত না স্টেপ! নতুন সরকারকে সবাই ভোট দিয়ে জয়যুক্ত করুন। দেশে পরিবর্তন আনুন। যেন বোতাম টিপলেই সব পাল্টে যাবে। চারপাশটি সেজে উঠবে।

অথচ, কত কাঠখড় পুড়িয়ে যখন এই পাল্টে ফেলা নিজেকে, সবাই তখন বিদ্রোহী। তাই হয়ত আজ অংশুর এই পরিবর্তন বড্ড বেমানান সবার কাছে! আশ্চর্য মানুষের মন! কী যে চায় তারা! কোনও ঠিকঠাক সিদ্ধান্ত নেই। ঘেন্না ধরে যায় একেকবার এই মানুষ জন্মে।  

    যাকগে অংশুর এখন এসব ভাবতে ভালো লাগছে না। বরং চোখগুলিকে ভালো করে লক্ষ্য করা যাক। ওই অপরিচিত চোখদুটিকে অংশু কিছুতেই চিনতে পারছে না। দৃষ্টিটাও কেমন ঘোলা ঘোলা! কোনও টিভি চ্যানেলের লোক? আই-কার্ড নেই যে টুপ করে দেখে নেবে। আই-কার্ড ব্যাপারটির প্রতি অংশুর অদম্য কৌতুহল। কিছু না জিজ্ঞেস করে একটা মানুষ সম্পর্কে প্রাথমিক পরিচয়টুকু সহজেই দিয়ে দেয় এই আই-কার্ড। এই আই-কার্ড নিয়ে অংশুর একটা দারুণ অভিজ্ঞতা আছে। মায়ের সঙ্গে সেবার ওরা অমরকন্টক যাচ্ছে। ট্রেন বেশ লেট। মা আর সে স্টেশনের ওয়েটিংরুমে বসে আছে, ট্রাভেল এজেন্সির লোকেরা ব্যস্ত হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে এদিকসেদিক । কিন্তু অংশুর বেশ লাগছিল। এই অপেক্ষা– আসবে আসবে ভাব। সবার ব্যস্ততা। সকলেই ঘুরে বেড়াচ্ছে চারপাশে। সবাই ছুটছে। আর তারা যেন দর্শক। সবাই ব্যস্ত। তারা স্থির। সমস্ত স্টেশন চত্বরটিকে চলচিত্রের মতো লাগছিল । ওয়েটিং রুমে বসে থাকা মানুষগুলো দেখছে সেই ছায়াছবি। নির্বাক জ্যান্ত ছায়াছবি। অজস্র শব্দ ভাসছে, কিন্তু কোনও শব্দকে ধরা যাচ্ছে না। একটা গমগম আওয়াজ। তবে কী অধিক শব্দে সব শব্দ হারিয়ে যায়! এসব ভাবতে ভাবতে অবাক লাগছিল অংশুর। আশ্চর্য লাগছিল। উপভোগ করছিল চারপাশটিকে। বিরক্ত মুখগুলিকে লাগছিল ভিলেন টাইপো; আর নিজেকে চ্যাপলিন। এমন সময় দারুণ দেখতে, একটা স্মার্ট মেয়ে অংশুদের মুখোমুখি সিটে এসে বসল। নেভি ব্লু কালারের টি-শার্ট। চোখে বাঁধানো ফ্রেমের  চশমা। কৌতুহলবশত অংশু মেতে উঠল আবিষ্কারে। পাওয়া গেছে! পাওয়া গেছে! মেয়েটির বুকে ঝুলছে প্রাথমিক পরিচয় পত্র। অংশুর চোখ গিয়ে আটকাল সেখানে। কিন্তু অক্ষরগুলো এত ছোট ছোট যে, অংশুর পড়তে বেশ কষ্ট হচ্ছিল। সময় লাগছিল। চোখ কুঁচকে যাচ্ছিল। হঠাৎ মেয়েটি তার দিকে কটমট করে তাকায়। তারপর উঠে চলে যায়। খুব হাসি পাচ্ছিল অংশুর। মেয়েরা যতই স্মার্ট হোক না কেন— কোথাও যেন একটা আটকে আছে!

   গ্রামে মেধাবী ছাত্র হিসেবে অংশু খুব পরিচিত। তাদের গ্রামে মাধ্যমিকে প্রথম স্কলারশিপ পেয়েছিল সে। গ্রামে প্রথম ফাস্ট ডিভিশন। মায়ের কথার স্বপ্ন তাকে ঘিরে। মামাবাড়ির লোকেরাও তখন আসত অংশুদের বাড়ি। মা এত একা হয়ে যায়নি তখনও । শুধু অংশুর জন্য মা ঠিক করে অংশুকে নিয়ে শহরে চলে আসার। অংশুকে বেস্ট স্টাডি দিতে হবে– শুধুমাত্র এই আশায় মায়ের ঘরের পরিবর্তন। শহরে এসে কোনমতে এই কলেজটাতে ঢুকতে পেরেছে মা। তারজন্যও মা’কে কম কাঠখড় পুড়োতে হয়নি! অংশুও তখন তার নিজের ভেতরে একটা পরিবর্তনের চক্করে ঢুকে পড়েছিল। মনে মনে চাইছিল সবকিছু ভেঙে যাক। নষ্ট হয়ে যাক। একটা বিরাট ঝড়! প্রলয়! ক্রমশ ছাত্র রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়ে সে। অনেক বন্ধু-বান্ধবী, ইউনিয়নের নেতা– সবসময়ই একটা ঘোরের মধ্যে কেটে যেত। স্বাভাবিকভাবেই রেজাল্ট খারাপ। মা সেদিন খুব কষ্ট পেয়েছিল। অংশুকে নিয়ে গেছিল কালীবাড়ি মন্দিরে। পুরোহিতকে বলছিল, যাতে ছেলের মতি ফেরে! অংশু অবশ্য তার আগেই ঠিক করেছিল এইসব ছোটখাটো রাজনীতি করে দেশ পাল্টানো যাবে না। বড় কিছু ভাবতে হবে। যাতে ঘুমন্ত মানুষগুলোকে  টলানো যেতে পারে। তারপর রাত জেগে এত প্ল্যান- চিন্তা ভাবনা। যদিও উপর মহল থেকে অংশুকে খুব বোঝানোর চেষ্টা করছিল সবাই। যাতে রাজনীতি না ছাড়ে। কিন্তু আজ কিছুতেই তার মেমোরি সাথ দিচ্ছে না। নাকি ভদ্রলোকটিকে কখনও দেখেনি সে! হতে পারে। কাউকে কী জিজ্ঞেস করবে উনি কে? সাহস হচ্ছে না। সবাই যেরকম ঝুঁকে আছে তার মুখের উপর! থাক, শব্দ আরম্ভ হলেই জেনে নেওয়া যাবে। শুধু একটু অপেক্ষা! কী আর করা যাবে! অপেক্ষা করা যাক বরং সেই গুঞ্জনটার! কতক্ষণ পরে কথা আরম্ভ করবে মুখগুলো! উফ! এখন অসহ্য লাগছে তার। কই এখানে তো মাকে দেখা যাচ্ছে না! তবে কী মা এখনও পর্যন্ত কলেজ থেকে ফেরে নি? মা কি এখনও জানে না? কেউ কী ফোন করেনি মাকে? ওহ! মা তো আজ মোবাইল ফোন নিয়ে যায় নি! অংশুই মায়ের ব্যাগ থেকে চুপ করে বের করে নিয়েছিল। ফোনটা বন্ধ করে দিয়েছিল। মা ফিরে নিশ্চয়ই খুব অবাক হবে। বকাবকি করবে অংশু কে? নাকি ছেলের এই অবস্থা থেকে স্তব্ধ হয়ে থাকবে কিছুক্ষণ? ভেঙে পড়বে খুব। খুব কষ্ট পাবে? কী আর করা! মায়ের জীবনটা খুব কষ্টের। বাবার কথা তো অংশুর মনে পড়ে না। শুনেছে বাবা রাজনীতি করত। দেশ পাল্টানোর স্বপ্নে মশগুল ছিল। ভাবত, দেশে পরিবর্তন আনতেই হবে। এভাবে মানুষ গিনিপিগের মতো বাঁচতে পারে না। আর সেই স্বপ্নে ছুটত। মায়েরও পূর্ণ সমর্থন ছিল তাতে। মা সংসার চালাত, আর বাবা ছুটত মিটিং-মিছিলে। সে যখন খুব ছোট, তিন বছরের, মিছিলে হাঁটতে গিয়ে বাবার বুকে গুলি লাগে। অন্যান্যরা তখন নিজের প্রাণ বাঁচানোর জন্য এদিক ওদিক ছোটাছুটি করছে। তার মধ্যেই বাবা শেষ। তারপর থেকে মা কেমন পাল্টে গেছিল। সবকিছুকে আকড়ে রাখতে চাইত। জীবনে রাজনীতি, পরিবর্তন এসবের প্রতি একটা ভয় যেন মাকে ঘিরে ধরেছিল। কিছুতেই অংশুর রাজনীতিতে ঢোকা মা পছন্দ করত না। ভাগ্যিস কলেজে এই পার্ট-টাইমের চাকরিটুকু ছিল। তাতেই মা আর অংশুর সংসার চলে। অংশুর মধ্য দিয়ে মা কত স্বপ্ন দেখে। অংশু চাকরি করবে। একজন প্রফেসর হবে। তাদের অবস্থা ফিরবে। এই এক কামরার ঘর ছেড়ে অংশু একটা ফ্ল্যাট নেবে। সেখানে থাকবে দক্ষিণ খোলা ব্যালকনি। শহরের অনেক দূর পর্যন্ত দেখা যাবে। দুর্গন্ধ নেই, মশা-মাছি নেই। কিন্তু আজ কলেজ থেকে ফিরে যখন অংশুটকে এমন অবস্থায় দেখবে! মা কী এই ঝড়টাকে সামাল দিতে পারবে? কিন্তু অংশু জানে মা মেনে নেবে। ধীরে ধীরে বুঝবে নিশ্চয়ই আজকের দিনে এই পরিবর্তনটুকুর খুব দরকার। সমাজে পরিবর্তন আনতে গেলে, সর্বপ্রথম নিজের ঘর থেকে শুরু করতে হবে। এই পরিবর্তন দেখে নিশ্চয়ই মায়েরও ওই কাফকার গল্পটি মনে পড়বে! যখন অংশু ছোট ছিল, মা পড়ে পড়ে শোনাত। অংশুও মাকে জাপটে ধরে ভেবে নিত কতকিছু। মায়ের গন্ধটা অংশুর খুব ভালো লাগত। বেশ ব্যাপার তো! হঠাৎ করে যদি সে একটা হুলো বেড়াল হয়ে যেতে পারত! কিংবা একটা ইয়া বড় বাঘ! তখন স্কুলে সবাই তাকেই মেনে নিত মনিটর বলে। ফিল্ডে তখন কোনও রাকেশের সিন থাকত না। কিন্তু তখন তো হয়নি। আজ এতদিন পরে, মা কি ঘরের মধ্যে এই বিরাট পরিবর্তন দেখে ব্যাপারটা খুব উপভোগ করবে? নাকি খুব কাঁদবে? চিৎকার করে কাঁদবে?  নাকি গুনগুন করে? ওই যে তাদের দেশের বাড়িতে যেভাবে লোকেরা কাঁদে? অজস্র সুরের সাহায্যে কথাকে জুড়ে দিয়ে। আশ্চর্য মোহনীয় সেইসব গানগুলি। এই শহরে কী কেউ এসব জানে? কান্নার সময় গান! শহরকে বললে তো তো হো হো করে হাসবে।  তাই আজ এরা এত নিঃশব্দ। আশ্চর্যের ভাষা নেই তাদের কাছে। বিস্ময়ের ভাষা নেই! শুধু দমবন্ধ চোখে সবাই চেয়ে আছে বাস্তবের দিকে। অতি বাস্তবতা কেড়ে নিচ্ছে মানুষের আবেগকে, বিবেকবোধকে।

উফ! এখন খুব গরম লাগছে। জানলা গুলো কেউ একটু খুলে দেবে! মনে হচ্ছে চিৎকার করে সবাইকে বলে, ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে। কিন্তু তার মুখ থেকে কোনও শব্দ বেরোচ্ছে না কেন? গলাটাও কেমন লাগছে। কী করবে এখন সে! ধূস!  মাথাটা গুলিয়ে যাচ্ছে। একটু কফি হলে ভালো হত। জটগুলো ছাড়ানো দরকার।

মানুষের গন্ধটা অসহ্য লাগছে তার। মানুষের গন্ধের যে এত বৈচিত্র্য হয় অংশু আগে কখনও জানত না। ওর কাছে শুধু দুটি গন্ধের পরিচিতি ছিল। একটি মায়ের আঁচলের গন্ধ। জাপটে ধরে শুয়ে থাকার গন্ধ। অন্যটি রিয়ার ঠোঁটের। রিয়ার ঠোঁটের গন্ধটি ছিল ঠিক ভদকার মতো। আশ্চর্য মোহনীয়। একটু একটু করে চুমুক দেওয়ার মতো। ধীরে ধীরে আস্তে আস্তে।

— একটা চুমু খেতে এতটা সময় লাগে তোমার?

— আরে! এসব কী তড়িঘড়ি খাওয়ার জিনিস!

–ঢঙ! তোমার সবেতেই আদিখেত্যা!

— আচ্ছা! এবার থেকে গোগ্রাসে খাব!

— থাক থাক হয়েছে!

— আর রাগছ কেন! দেখো, পৃথিবীর সব সুন্দর জিনিস তখনই উপভোগ করা যায়, যখন ধীরে ধীরে তার মধ্যে প্রবেশ করা যায়। সুন্দর ভাবে। তাকে আবিষ্কার করা যায়।

ফিক করে হেসে ফেলেছে রিয়া।

 আঙুলে অংশুর চুলগুলোকে একটু আলুথালু করে দিত তখন।

হাসলে রিয়াকে খুব সুন্দর লাগে। স্নিগ্ধা। ঠিক তার মায়ের মতো। অংশু যদি রিয়াকে বলে তাকে তার মা লাগছে! রিয়া খুব ক্ষেপে যাবে! নিশ্চয়ই ক্যালাবে। কিন্তু এই মাতৃরূপী রিয়াকে অংশুর খুব ভালো লাগে। আশ্রয় খুঁজে পায়। মায়ের মতো আশ্রয়। নিশ্চিন্ত। পৃথিবীতে কত কথা বলা যায় না। গোপনে রাখতে হয়। সিন্দুকে রাখার মতো করে। কোনদিন প্রকাশ করা যায় না। কোনদিন কাউকে বলা যায় না– কখনও বলা যাবে না—এমন সব কথা নিয়ে কখনও কী কোথাও সার্ভে হয়েছে! অংশু জানে না। জেনে নিতে হবে। ঝলককে একবার জিজ্ঞেস করতে হবে। কিছুদিন আগে মাদার্স ডে তে দেখছিল একটা সার্ভে! অসুখী মায়েদের সার্ভে। তাতে দেখা যাচ্ছিল সত্তর পার্সেন্ট মা অসুখী। আর তিরিশ পার্সেন্ট মা সুখী। অংশুর মা কোন দলে পড়ে! অংশু সংখ্যাটি জানার পর মাকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে বোঝার চেষ্টা করেছে। মায়ের প্রতিটি কাজের উপর নজর রেখেছে। যতক্ষণ মা বাড়িতে থেকেছে মা কে খুশি রাখার চেষ্টা করেছে। কিন্তু মায়ের মধ্যে কিছুই তেমন খুঁজে পায়নি। দেখেছে, মা আসলে সুখীও নয়, অসুখীও নয়। মাঝামাঝি। অংশু নিশ্চিত হয়েছে। এই অবস্থানটিকেই অংশুর সবচেয়ে বাস্তব মনে হয়। অত্যন্ত সুখী বোঝাতে একটা মুখোশ ঢাকা মুখের কথা তার মনে আসে। যেন কাউকে পরোয়া না করে শুধু মুখোশের চাকচিক্যটাই এখানে দ্রষ্টব্য। তার তখনই সবকিছু মিথ্যে লাগে তার। আবার সবসময় দুঃখের ব্যাপারটাও অসহ্য। জাস্ট অসহ্য। প্যানপ্যানানি। মাকে আবিষ্কারের পরে সে বুঝতে পেরেছিল মা এখনও পুরোপুরি জ্যান্ত। মানে পুরোপুরি বাস্তবে আছে। জীবনটাকে বুঝছে। মায়ের মুখোশ নেই। পরেরদিন এই আশ্চর্য খবরটি ঝলককে জানিয়েছিল সে। ঝলক এসব খবর খুব রাখে। পৃথিবীর সব সার্ভের খবর তার কাছে থাকে। সাধারণত কোনও তথ্যের দরকার পড়লেই সে ঝলককে ফোন করে। অবশ্য ঝলকের সঙ্গে রোজ তার একবার দেখা করা চাই। কই এখানে তো ঝলককে দেখা যাচ্ছে না। আসেনি? কিন্তু এতক্ষণে তো তার খবর পেয়ে যাওয়া উচিত। আরে ওই তো! কী দেখছে? ওখানে তো অংশুর  ডাইরি,  ল্যাপটপ থাকে। কী খুঁজছে? উফ! ওই ট্যাবলেটের প্যাকেট টি যদি পেয়ে যায়! দূর ছাই! চিৎকার করে ডাকাও যাবে না। সবাই এত নিশ্চুপ হয়ে আছে। এখানে চিৎকার করে ওঠাটা বেমানান হবে! হোক। তবুও ঝলক কে থামাতে হবে।

— ঝলক! অ্যাইইইইই ঝলক। ওখানে কী করছিস? শোন এদিকে!

অংশুর গলাটা ব্যথা করছে কেন? ফুলে ফুলে উঠছে। অথচ কোনও শব্দ বেরোচ্ছে না। আরে বাহ্! সাউন্ড ব্যাপারটাই উবে গেছে মনে হচ্ছে।

দৌঁড়ে যাবে সে ? উঠতে হবে বিছানা থেকে। কিন্তু এতগুলো ঝুঁকে থাকা চোখ পেরিয়ে কীভাবেই বা উঠবে অংশু! যাকগে  ঝলক যা করছে করুক। পারা যাচ্ছে না আর। এমনিতেই দমবন্ধ লাগছে। ঝলক কেন সবাইকে এখান থেকে চলে যেতে বলছে না!

— ঝলক! অ্যাইইইইই ঝলক

খুব অসহায় লাগছে।

  অংশুর এখন খুব ভয় করছে সবার এই চোখগুলিকে। শব্দহীন মুখগুলিকে। সবাইকে মৃত লাগছে। অসুখী? যেন একটা মৃত উপত্যকার কবরখানা থেকে তুলে আনা হয়েছে এদের। অনেকক্ষণ কান পাতার পরে দূর থেকে কিছু শব্দের আওয়াজ ভেসে আসছে। অংশুর একটু হলেও স্বস্তিবোধ হচ্ছে। যাকগে! এই মৃতের মত চোখগুলিকে ছেড়ে অন্য কিছু নিয়ে ভাবা যাক। আচ্ছা এখন ক’টা বাজে? সবাই কী বেরিয়ে পড়েছে ক্রিকেট খেলতে! তারই শব্দ আসছে বোধহয়। হ্যাঁ তাই। অংশু আরও গভীরভাবে শোনার চেষ্টা করে। কাল অংশুদের টিম জিতেছে। আজও খেলতে গেলে হয়। কিন্তু কেন আজ কেউ অংশুকে ডাকতে আসছে না! ওরাও কী খবরটা পেয়ে গেছে এতক্ষণে? অংশুর এখন খুব মনখারাপ লাগছে। মায়ের আসার সময় কখন হবে! কেন এত দেরি করছে মা। কেন কেউ মাকে খবর টি দিচ্ছে না! প্লিজ কেউ মাকে ডেকে দাও। খবর দাও।

কী একটা শব্দ হল না! গেট খোলার শব্দ। তবে কী মা এল? ঝুলে থাকা চোখগুলি নড়ে উঠল? চোখের দ্বারাও ফিসফিস করা যায়! যাক বাবা, এতক্ষণ যে সবাইকে মৃত ভাবছিল, তা নয়। নিশ্চিন্ত হওয়া গেল। কিন্তু গেটের শব্দ শোনা গেল কিন্তু কেউ তো এল না! মা নয় তবে? রিয়া? রিয়া এসেছে তবে শেষপর্যন্ত! দীর্ঘ চারদিন পরে রিয়াকে দেখল সে। দীর্ঘ ই বটে! এত ঝগড়া, মনকেমন ইত্যাদি হলেও প্রতিদিন ওদের একবার দেখা করা মাস্ট ছিল। মাও রিয়াকে খুব পছন্দ করে। রিয়াও যখন খুশি অংশুদের বাড়িতে চলে আসে। তখন অংশুর মনে হত, রিয়া বুঝি তার মাকে কেড়ে নিচ্ছে। মা রিয়ার হয়ে যাচ্ছে। ঈর্ষা হত। তারপর নিজেই নিজের মাথায় চাটি মারত! উফ! কী সঙ্কীর্ণ হয়ে যাচ্ছে সে দিন কে দিন! কিন্তু এবার অংশু ইচ্ছে করেই রিয়াকে ফোন করেনি। কেন অংশুই সবসময় রাগ ভাঙাবে রিয়ার! সব দায় বুঝি অংশুর! রিয়াও ফোন করেনি। রিয়া কী তবে অংশুর প্রতি ইন্টারেস্ট হারিয়ে ফেলছে! এই রিয়াকে দেখে দেখে অংশুর খুব ভাল লাগছে। আলুথালু চুল, ফুলে ওঠা ঠোঁট, জলভর্তি চোখ। ছুটে গিয়ে জড়িয়ে ধরতে ইচ্ছে করছে। বলতে ইচ্ছে করছে– আসুন ম্যাডাম অবশেষে তবে খবর পেয়ে এলেন মহারানী। আসুন আসুন।

অংশুর দিকে তাকিয়ে কাঁদছে কেন? আরে একী! এমন অবস্থা কেন চোখে-মুখের। রিয়াকে দেখে খুব কষ্ট হচ্ছে অংশুর। খুব। এই দু’ঘন্টার মধ্যেই এতটা পাল্টে গেছে রিয়াও। আলুথালু চুল। চোখ দুটো ফুলে আছে। কেমন একটা উদ্ভ্রান্ত উদ্ভ্রান্ত লাগছে।

অংশু হাত নেড়ে ডাকে।

— রিয়া, প্লিজ একটু জানলা টা খুলে দাও। আমার ভ্যাপসা লাগছে।

রিয়া কেন শুনছে না তার কথা!

— রিয়া রিয়া

— রিয়া, প্লিজ এই ঝুলে থাকা চোখেদের সরে যেতে বল। তাড়িয়ে দাও এখান থেকে। আমার অসহ্য লাগছে।

— রিয়া, গলাটা শুকিয়ে গেছে, একটু জল খাওয়াবে?

–রিয়া, রিয়া

এইতো রিয়া আসছে অংশুর কাছে। যাক, তবে শুনতে পেয়েছে অংশুর কথা।

–ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছিস কেন সোনা?

রিয়াও তো চাইত অংশুর মধ্যে পরিবর্তন। চাইত, অংশু পাল্টে যাক। শান্ত হয়ে যাক। রাজনীতি ছেড়ে দিক। ক্যারিয়ারে মন দিক। তবে কেন কাঁদছে? পরিবর্তন মেনে নিতে পারছে না! কিন্তু রিয়া এই পরিবর্তনটুকু তো মানতেই হবে। নাহলে যে আমাদের অবস্থান পাল্টাবে না। সারাজীবন গিনিপিগ হয়েই থাকতে হবে! মেনে নাও রিয়া, মেনে নাও।

কী খুঁজছে রিয়া। উফ! কী গরম রিয়ার স্পর্শ। রিয়ার কী তবে জ্বর! নাকি অংশু শরীর ঠান্ডা হয়ে গেছে! মৃতদের মতো? নাকি সরীসৃপদের মতো? রিয়া এত ভয় পাচ্ছে কেন অংশুকে?

অংশু বুঝেছে রিয়া এই পরিবর্তন মেনে নিতে পারছে না। কিছুতেই না। অংশুর মোবাইল ফোনটি নেওয়ার জন্য তার কাছে এসেছিল। ফোনের জন্য! অংশুর জন্য নয়। তাই এমন চমকে উঠল স্পর্শ লেগে যেতে! কার নাম্বার খুঁজছে? মায়ের? কলেজের? অফিস রুমের?

চোখগুলো এখন রিয়ার দিকে ঘুরে গেছে। অংশু এখন বেশ একা। আরাম লাগছে। উফ! এত চোখের সঙ্গে বসবাস করা কী আর যে সে ব্যাপার। রিয়ার মায়ের সঙ্গে কথা বলছে। বেশ, গুছিয়ে গুছিয়ে কথা বলছে। মাকে বোঝাচ্ছে। রিয়াকে আজ অংশুর, মনে হচ্ছে, বোন। তার নিজের বোন। ঝলকের বোন যখন অংশুকে ভাইফোঁটা দিত, তখন একজন বোনের জন্য অংশুর মন খুব কাঁদত। ভাবত, ঝলকের মত তারও একজন বোন দরকার। খুব ছোটবেলা মাকে একবার বলেছিল, হাসপাতাল থেকে একটা বোন যেন এনে দেওয়া হয় তার জন্য। তারজন্য সে দুটো দিন না হয় মাকে ছেড়েই ঘুমাবে। একা একা স্কুলে চলে যাবে। মাসি খুব হেসেছিল। মা শুধু উদাস হয়ে গেছিল কীরকম! আজ রিয়াকে তার বোন ভাবতে খুব ভালো লাগছে। রিয়া তাকে রাখী পরাবে এবার থেকে? ভাইফোঁটা দেবে? অংশু রিয়ার জন্য একটা দারুণ লিপস্টিক কিনে আনবে। একদম ঝগড়া করবে না। সারাদিন রিয়া তাদের বাড়িতে থাকবে। খুব ভালো হবে। মাও খুব খুশি হবে। মা কে ‘মা’ বলে ডাকল রিয়া! খুব ভাল। অংশুর চিন্তা গেল! মায়ের জন্য টেনশন কমল। আচ্ছা, মা এবার থেকে রিয়াকে তার সন্তান ভাববে? অংশুকে ভুলে যাবে মা? মা যা যা চায়, একজন সন্তানের কাছে সব রিয়ার মধ্যে আছে। রিয়া মাকে খুব সুখী রাখতে পারবে। খুব সুখী। ভালোই হল। অংশুও নিশ্চিন্ত হতে পারবে। ধূস! মনটা খারাপ লাগছে কেন? রিয়ার প্রতি ওই পুরানো ঈর্ষাটি জেগে উঠছে কেন পৃথিবীতে অংশুর তো নিজের বলে আর কেউ নেই, শুধু মাত্র মা ছিল। মা কেও রিয়া কেড়ে নেবে?

রিয়া ফোন রেখে দিল। এখন আর কাঁদছে না। বেশ কিছুটা স্বাভাবিক লাগছে। শক্তও। শোক কমে আসছে। বিস্ময় কমে আসছে। লোকগুলোও অংশুর থেকে চোখ সরিয়ে নিচ্ছে। আচ্ছা একটা বিষয়ের প্রতি মানুষের শোক কতক্ষণ বেঁচে থাকে? অংশু বুঝতে পারছে সুখের মতো শোকটাও ক্ষণকালের। কিছুটা সময়ের। সময়টাই এখানে ফ্যাক্টর। তারপর সব স্বাভাবিক। রিয়ার এই কঠিন ভাবটিকে অংশু কিছুতেই সহ্য করতে পারে না। মুখোশ মনে হয়। রিয়ার  এই অবস্থাটিকে কিছুতেই বুঝতে পারে না অংশু। উফ! খুব রাগ হচ্ছে।  ঝলকের সঙ্গে কিছু একটা আলোচনা করছে রিয়া। এত আস্তে কথা বলছে ওরা! অংশু কিছু শুনতে পাচ্ছে না। অংশুর দিকে একবার আড়চোখে তাকাল ওরা। ঝলক ওষুধের প্যাকেটটা দেখাচ্ছে রিয়াকে। বিজ্ঞাপনটিকে গোল মার্ক দিয়ে ঘিরে দিয়েছিল অংশু, যাতে পরে খুঁজে পেতে সহজ হয়। ওটাও ঝলক, রিয়াকে দেখাচ্ছে। বিড়বিড় করে কিছু বলছে। রিয়া আবার চোখ মুছছে। কাঁদছে। ঝলকের সামনে কাঁদছে রিয়া? রিয়া তো কখনও এমন করে না। অংশুর সঙ্গে ঝগড়া হলে আশ্চর্য নীরবতা গ্রহণ করত সে। কঠিন নীরবতা। কখনও তো কাঁদতে দেখেনি। বরং তিন চার দিন পরে, অংশু ফোন করলে ভাঙা গলায় অংশুকে একটা সরি বলত। ব্যস এটুকুই। আজ কী হল রিয়ার! খুব ইচ্ছে করছে রিয়াকে বুকে টেনে নিতে। আদরের করতে ইচ্ছে করছে তার। কিন্তু একটা অভিমানও মাথা চাড়া দিয়ে উঠছে। ঝলকের প্রতি ঈর্ষা হচ্ছে। রিয়াও আশ্চর্য, অংশুর কাছে না এসে, ঝলকের সঙ্গে এত কী কথা তার! এত কথা রিয়া শিখল কবে থেকে! এত সবর হল কী ভাবে! রিয়ার মধ্যেও কী তবে পরিবর্তন এসেছে!

কার নাম্বার খুঁজছে তারা? বনদপ্তরের? ওই অচেনা লোকটির সঙ্গে ঝলক আলাপ করিয়ে দিচ্ছে রিয়ার। রিয়া হাতজোড় করে নমস্কার করছে। করুণ চোখে কথা বলছে লোকটির সঙ্গে। মনে হচ্ছে, লোকটি ভগবান! রিয়াকে যা পথ দেখানোর ওই দেখাবে। উফ! আর মেনে নেওয়া যাচ্ছে না। রিয়ার সঙ্গে খুব ঝগড়া করতে ইচ্ছে করছে। চিৎকার করে বকতে ইচ্ছে করছে। তাতে রিয়া যদি তাকে মেল শেভনিস্ট বলে বলুকগে যাক। পাত্তাই দিচ্ছে না অংশুকে আজ! ধূস! মনটা আবার খারাপ হয়ে যাচ্ছে।

এসব ছোট খাটো ব্যাপারে অংশুর আর নাক গলাতে ইচ্ছে করছে না। যাকগে। এখন অনেক কাজ তার। সামনে অনেক পথ। স্বপ্ন। রিয়ার মায়া ত্যাগ করতে হবে তাকে। এই সমাজ, এই সংসারে থেকে কিছু কাজ করা যাবে না। বৃহৎ কিছুর জন্য ছোটোখাটো ত্যাগের প্রয়োজন আছে। বিনয়দা বলেছিল। বিনয় মাইতি। তাদের রাজনৈতিক দলের নেতা। বিনয়দা বুঝবে অংশুর এই পরিবর্তনের মর্ম। খুব খুশি হবে। সবাইকে বলবে অংশুর কথা। অংশুর মতো হতে সবাইকে উৎসাহ দেবে। বলবে

— তোমরা যা পারোনি, অর্চিমান তাই করে দেখিয়েছে! দেশের পরিবর্তন এবার আমাদের হাতের মুঠোয়। মিশন সাকসেস।

অংশু কৃতজ্ঞতা বশে শুধু মাথা নাড়বে। মাথা নাড়বে। একবার এদিক একবার অন্যদিক। একবার সোজা … আর সবাই কৌতুহল নিয়ে তাকে দেখবে।

   যাক এতক্ষণ পরে একটা ঠান্ডা বাতাস ঢুকছে ঘরে। সবাই এবার, অংশুর থেকে মুখ তুলে দেখছে রিয়ার দিকে, অপরিচিত লোকটির দিকে। চোখগুলো ঘুরে গেছে। ঠিক ক্যামেরার লেন্স ঘোরানোর মতো। ওদের কথা শোনায় ব্যস্ত সবাই। কীসব আলোচনা করে যাচ্ছে। কিন্তু অংশু বুঝতে পারছে আলোচনাটা তাকে নিয়েই। যাকগে! তাতে অংশুর কিচ্ছু এসে যায়না। অংশু যা চেয়েছিল, পেয়ে গেছে। যাকগে, বাঁচা গেল। কেউ আর অংশুর দিকে তাকিয়ে নেই। ঝুলে পড়া চোখগুলি জ্যান্ত হয়ে কথা শুনছে। কৌতুহল খেলা করছে এখন চোখগুলিতে। আবার পলিউশন বাড়ছে। শব্দ পলিউশন…

 অংশু এবার  মুখ উঁচু করে শ্বাস নিতে পারবে। তার এখান থেকে বেরিয়ে যেতে ইচ্ছে করছে। ওই তো জানলাটাও খোলা। কিন্তু এই সরু সরু পা নিয়ে কোথায় যাবে অংশু! আমাজনে? নাকি ওই চাঁদের পাহাড়ে? মন্দ হয় না! চুপিচুপি যেতে হবে। মাকে বলা যাবে না। কিছুতেই না। মায়ের সঙ্গে দেখাও হলনা। না দেখা হওয়াই ভালো। মায়ের কষ্ট হবে। তাছাড়া রিয়া তো আছে। মা কে দেখবে। ঝলক আছে। মা তাকে খুব স্নেহ করে। অংশু বরং ধীরে ধীরে বেরিয়ে পড়ুক এইবার— পাতার আড়ালে আড়ালে। গাছে গাছে। একবার সবুজ, একবার হলুদ, পিঙ্ক, ব্লু— আজ থেকে তার কত রঙ! কত রূপ! পরিবর্তন হাতের মুঠোয় …

Leave a Reply

Your email address will not be published.