করোনার চালচিত্র

নাসরিন নাজমা

প্রথমদফায় ১৮৫ ,পরে আরও একদল নার্স মিলে সংখ্যাটা প্রায় ৪০০ ! হ্যাঁ, যারা ছিল কর্পোরেট স্বাস্থ্যব্যবস্থার শিরদাঁড়া,মূলত যাদের প্রতিদিনের ঘামের বিনিময়ে ঝকঝকে দামি হাসপাতালের ধবধবে বিছানায় আপনারা সুস্থ হয়ে ওঠেন রোজ, সেই নার্সরা গনইস্তফা দিয়েছে।যারা ভিন রাজ্য থেকে এসেছিল তারা ফিরেও যাচ্ছে নিজ রাজ্যে।আর এতেই  বেশ কয়েকটি চিন্তার ভাঁজ পড়েছে কর্পোরেট মালিক সহ রাজ্যের স্বাস্থ্য আধিকারিকদের কপালে।অবশ্য এটা হওয়ার দরকার ছিল।অন্তত এতদিনে মালিকশ্রেণী, সাধারন মানুষ,সরকারপক্ষ সবাই ঘুরিয়ে নাক দেখানোর মত করে হলেও স্বীকার করেছে নার্সদের অবদানের কথা।আমরা ছাড়া যে বিকল হয়ে পড়বে সবকিছু সেই বোধদয় হয়েছে এটাই বা কম কী?অন্যদিকে গতকাল স্বাস্থ্য দপ্তরের আধিকারিকদের একটি দল এসেছিলেন রাজারহাটের covid হাসপাতাল পরিদর্শনে।তাঁরাও আমাদের ডেকে বলে গেছেন করোনা মোকাবিলায় রাজারহাট covid হাসপাতাল এখনো পর্যন্ত সবচেয়ে ভালো পারফরম্যান্স দেখিয়েছে এবং তা সম্ভব হয়েছে নার্সদের অক্লান্ত পরিশ্রমের কারনেই।এই প্রাপ্তিও অনেকখানিই।

রোগী পরিষেবা দিতে গিয়ে এরমধ্যেই আক্রান্ত হয়েছেন অনেক নার্স।মেডিকেল কলেজ, ইনস্টিটিউট অফ চাইল্ড হেলথ ,জঙ্গিপুর জেলা হাসপাতাল এরকম  উদাহরন অনেক।ইনস্টিটিউট অফ চাইল্ড হেলথ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কায়।সামনে যুদ্ধপথ কত লম্বা আমরা জানিনা।আরও কত সহযোদ্ধা আক্রান্ত হবে সেটাও ভবিষ্যতের হাতেই।তা স্বত্বেও নার্সরা কাজ করবেন ,কারন তারা পেশার কাছে, সমাজের কাছে দায়বদ্ধ।শুধু covid19 এর ভয়ই নয় সমস্যা আরও।ward এ কাজ করার সময় নিজেদের আত্মরক্ষার জন্য পরতে হয় PPE।এই বস্তুটি রোগ ছড়িয়ে পড়া থেকে বাঁচালেও খুব সুখকর কিছু নয়।দীর্ঘসময় PPE পরে অসুস্থ হয়ে পড়ছেন অনেকেই।এই জৈষ্ঠ মাসের গরম, তাতে AC বন্ধ।দরদর করে ঘাম হচ্ছে PPEর ভেতরে দমবন্ধ হয়ে আসা শরীরে।স্টাফরা যখন doffying করে ফিরছে অর্থাৎ PPE খুলে ফিরে আসছে ward থেকে তখন তাদের জামাকাপড় পুরো ভেজা, ঠিক যেন সাঁতার কেটে ফিরে এলো।চেনাসূত্রে খবর পেয়েছি একটি মেয়ের এতটাই ঘাম বেরিয়েছে, এত বেশি fluid loss হয়েছে,সেই মেয়েটি এখন CCU তে চিকিৎসাধীন।

সরকার covid যোদ্ধাদের জন্য ঘোষণা করেছে ১০  লক্ষ টাকার জীবনবীমা।কোনো টাকার অঙ্ক দিয়েই কি একজন মানুষের প্রাণের দাম মেটানো যায়!যদি এমন হয় যে একজন নার্স যার একটি ফুটফুটে ছোট্ট বাচ্চা আছে, সেই নার্স আক্রান্ত হয়ে হলেন এবং মারা গেলেন ।ওই দুধের শিশুটির মা হারানোর দাম মূল্য ১০ লক্ষ  টাকায় চুকে যাবে!
আবার এটাও ভাবছি তবুও তো যারা চাকরি করছি খেয়ে পরে বেঁচে আছি।কিন্তু যাদের কাজ নেই, lock down এর কারনে যারা কাজ হারিয়েছে তাদের কী করে চলবে।যাদের হাতে কিছু সঞ্চয় আছে বা alrernative কোনো উপায় আছে তারাও নুন ভাতের জোগাড় টুকু হয়তো করতে পারবে।কিন্তু যারা দিন আনে দিন খায় যেমন কলকারখানার মজুর, রিক্সাওয়ালা,চা-বাগানের শ্রমিক,প্রান্তিক স্তরের ছোট ছোট ব্যবসায়ী যাদের দোকান পাট সব বন্ধ  তাদের রুটি রুজির পথ তো সম্পূর্ন বন্ধ।এরা কী করবে এই দুঃসময়ে!কী করে দু’মুঠো অন্ন সংস্থান হবে তাদের!

Lock down এর এই সময়ে একটি নতুন শব্দ বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে,”পরিযায়ী শ্রমিক”।জীবিকার সন্ধানে এক জেলা থেকে শুরু অন্য জেলা, এক রাজ্য থেকে ভিন্ন রাজ্য এমনকি দেশের বাইরেও শ্রমিকরা পাড়ি জমায়।পশ্চিমবঙ্গ থেকে বাইরে কাজের সন্ধানে যাওয়া এরকম migrant labour এর সংখ্যা অনেক ।শুধুমাত্র মুর্শিদাবাদ জেলা থেকেই কয়েক লক্ষ শ্রমিক ঘর ছাড়ে পেটের দায়ে।কেরালা, চেন্নাই,মুম্বই,পুনের মত শহরগুলোয় ছড়িয়ে আছে এরকম অনেক শ্রমিক।lock down এ তাদের হাতে কোনো কাজ নেই, নেই রোজগারের কোনো উপায়।সরকারি উদ্যোগে বা NGOগুলির সহায়তায় কেউ খাবার পাচ্ছে ,কেউ বা সেটাও ঠিক আছে মতো পাচ্ছেনা।সরকার মাথাপিছু চাল ডাল বরাদ্দ করেছে কিন্তু সেটাও কী পর্যাপ্ত প্রয়োজনের কাছে?বা সরকার কতদিন এই যোগান দিতে পারবে!এই যোগান বন্ধ হয়ে গেলে তারপর কী হবে ওদের?

এই দুর্দিনে একবুক হতাশা, আশঙ্কা,একপেট খিদে নিয়ে ওরা ঘরে ফিরবার, আপনজনদের কাছে ফিরবার অপেক্ষায় আকুল হয়ে আছে।ট্রেন বন্ধ,বাস বন্ধ।কেটে গেছে প্রায় দু’মাস।এখনও পর্যন্ত ওরা ঘরে ফিরবার কোনো উপায় না পেয়ে বেছে নিয়েছে নিজেদের পথ।কেউ পায়ে হেঁটে, কেউ সাইকেল চেপে নেমে পড়েছে রাস্তায়, নেমে পড়েছে অজানা ভবিষ্যতের পথে।দীর্ঘ পথের শেষে কেউ পৌঁছতে পারছে নিজের ঘরে ।কেউ বা রাস্তায় গরমে, অনাহারে, জলের অভাবে মারা যাচ্ছে।রাস্তায় গাড়ির  ধাক্কা, ট্রেনের ধাক্কা গোদের উপর বিষফোঁড়ার মতো মাঝে মাঝেই বন্ধ দিতে চাইছে ওদের ঘরের ফেরার গান।খবরের কাগজে, টিভির পর্দায়, সোশ্যাল মিডিয়ায় চারদিকে শুধু করুন মুখের মিছিল।সদ্যজাত সন্তানকে কোলে নিয়ে মাইলের পর মাইল পথ হাঁটছে এক মা, আরেক মায়ের দুধের শিশুটি পথের ক্লান্তিতে ঘুমিয়ে পড়েছে।মা ব্যাগের উপর বাচ্চাকে শুইয়ে সেই ব্যাগ টেনে নিয়েই জারি রেখেছে চলা,কোথাও প্রখর সূর্যের তাপে বিধস্ত মানুষ ধুঁকছে রাস্তার পাশেই, তাদেরব পায়ের তালু রক্তাক্ত, বড় বড় ফোস্কা।এসব দেখতে দেখতে শিউরে উঠছি, কষ্টে রাগে দপদপ করছে মাথা।বাধ্য হয়ে খবর দেখা বন্ধ করেছি।কিন্তু চোখের উপর ভেসে ওঠা ওই  মুখগুলো সরছে না কিছুতেই।

জ্যৈষ্ঠের গরমে দিনের বেলা রোদ মাথায় পথ চলতে ভীষন কষ্ট।ওদের অনেকেই চেষ্টা করছিল রাতের দিকে বেরিয়ে পড়তে,যাতে করে রোদ গরম এড়িয়ে একটু বেশি পথ চলা যায়।এখন সেই পথও বন্ধ।সরকার দেশজুড়ে সন্ধ্যে সাতটার পর থেকে সকাল পর্যন্ত জারি করেছে কারফিউ।যুক্তি করোনা মোকাবিলা।এই যুক্তি যে কতটা অযৌক্তিক তা দেশচালকেরা সবাই জানেন।তবুও কেন এই প্রহসন তার কোনো উত্তর নেই।শুধু ওই গরিব মানুষগুলো রাস্তায় দলে দলে ঢলে পড়বে মৃত্যুর দিকে।আর সরকার তাদের উপদেশ দেবে আত্মনির্ভরশীল হতে!

এই দেশে হয়তো এটাই স্বাভাবিক ব্যাপার।যখন রোগের Uপ্রকোপে, খাবারের অভাবে রোজ মৃত্যু মিছিল চলছে, তখনো নেতা মন্ত্রীরা চিন্তিত অস্ত্র নিয়ে।বেশ কিছু অস্ত্রশস্ত্র যাতে বিদেশ থেকে আমদানি না করে নিজেদের দেশেই বানিয়ে নেওয়া যায় সেই ভাবনা ভালোই।তবে সেই কারনে এই মুহূর্তে FDI ৪৯% থেকে বাড়িয়ে ৭৯% করে দেওয়ার যুক্তি আমার মত আকাটের মাথায় ঢোকেনি কিছুতেই।করোনা একদিন নিশ্চয় পিঠটান দেবে,রোগমুক্ত হবো আমরা।কিন্তু দুর্ভিক্ষের,অনাহারের যে ভয়ঙ্কর অবস্থা তৈরি হবে তার কী হবে সেই উত্তর জানা নেই।

“শেষ হয়েও হইলো না শেষ” বোধহয় একেই বলে।নার্সদের নিয়ে এত ভালো ভালো কথা বলা হয়েছে,তাদের কাজের গুরুত্ব মোটামুটি অনেকেই বুঝে গেছেন।নার্স ছাড়া যে স্বাস্থ্যব্যবস্থা আদতে পঙ্গু হয়ে পড়বে সেটাও সকলের জানা।তবুও আবার সরকারের তরফে বলা হয়েছে শিক্ষিত ছেলে মেয়েদের short term কোর্স করিয়ে নার্সিংএর কাজে লাগানোর কথা।সাতদিন ট্রেনিং দিয়ে লোকাল ছেলে মেয়েদের দিয়ে স্যালাইন চালানো, অক্সিজেন দেওয়া, টেম্পারেচার চেক করার কথা।এর আগেও সাতদিনে নার্স তৈরির জন্য কথা আমরা শুনেছি।কোনদিকে নিয়ে যেতে চাইছেন তাঁরা আমাদের স্বাথ্যব্যবস্থাকে?আম আমড়া সব এক হয়ে যাচ্ছে!যে দেশে আয়া ,রাঁধুনির সাথে নার্স পাওয়ার বিজ্ঞাপন দেওয়া হয় সেখানে সাত দিনে নার্সিং হেল্পার তৈরির কারখানার এফেক্ট কিরকম হয় সেটাই দেখার বিষয়।শুধু ভাবছি যাঁরা এই কথাগুলো বলছেন তাঁরা কি নার্সিং সম্বন্ধে সত্যিই এতটা অজ্ঞ নাকি জেনে বুঝেই বিভ্রান্ত করছেন মানুষকে?নাকি তাঁরা সিভিক পুলিশ দিয়ে কাজ চালানোর মত সিভিক নার্স দিয়ে স্বাস্থব্যবস্থা চালাতে চাইছেন এটাই এখন লাখ টাকার প্রশ্ন!

Leave a Reply

Your email address will not be published.