ইমিউনিটি

ভজন  দত্ত 

আজ কদিন ধরেই প্রতিম ভেতরে ভেতরে এক অশান্তিতে ভুগছে। কথাটা ওর স্ত্রী রমাকেও বলতে পারেনি। 

ওর বাবা মারা গেছে, তা প্রায় বছর পাঁচেক হলো! আর এখন,এই ভোগান্তি সময়ে প্রতিম যখনতখন আয়নার সামনে দাঁড়ালেই ওর বাবাকে দেখতে পায়।

প্রতিম ভাবে, এ কি কোনো অসুখের লক্ষণ!

একাএকা আয়নার সামনে দাঁড়ালেই প্রতিম দেখতে পায়,সেই কাঁচাপাকা চুল,আধো-অন্ধকার মাখা মুখ।অযত্নে বেড়ে ওঠা একমুখ ভর্তি সাদা দাড়িতে বয়সের চেয়েও ভারি বয়স আঁকা দুচোখের কালিতে।কপালের ভাঁজে আঁকাবাঁকা পথের ওঠানামা কিংবা জীবনের গানের স্বরলিপি লেখা,সেই তার বাবা!

প্রতিম শুনতেও পায় আয়নার ভেতর থেকে তার বাবার কথা। তিনি বলেন,
‘চিন্তা করিস না বাবু,সময় কখনো থেমে থাকে না।আজ দুর্দিন কাল সুদিন, আজ খাড়াই তো কাল ঢালু পথ, এই তো জীবন রে! ভাবিস না, কর্ম কর… ‘

প্রতিম ওর বাবাকে বলে-
‘ বাবা,কী কর্ম করবো!তুমি তো এমন দিন দেখোনি বাবা! কর্ম থাকতে থাকতেই আমি, আমরা তো সব কর্মহীন! কাজকারবার সব বন্ধ! দেখেছো এমন দিন!
গত নব্বই দিন আমাদের অফিস বন্ধ! জাস্ট তালা!কর্তা ওয়ার্ক ফ্রম হোমের কোনও অর্ডার দেননি! ফোন করেছি, ফোন ধরেন নি।শুধু বিজি-বিজি-বিজি টোন শুনে গেছি! জমানো কটা টাকায় সংসারের জন্য ইমিউনিটি কিনতে কিনতে  ব্যালেন্সের খাতা, ছেলেবেলায় আঁকা একটা বড় বলের কাছাকাছি। 

জানো বাবা,আমার কর্তা,আমার বস, তার তো দৈনিক লক্ষ লক্ষ টাকা উপার্জন!অফিস বন্ধ ঘোষণার দিন পনেরো পর থেকেই কর্তাকে ফোন করতে করতে যখন বাষট্টি দিনের মাথায় তাকে পাই, বলি-
‘স্যার,আপনি তো সবই জানেন!গত সাতাশ বছর সতের দিন আপনার সেবা করে গেছি স্যার!আমার সম্পর্কে আপনার তো অজানা কিছুই নেই স্যার!আর পারা যাচ্ছে না স্যার!গত দুমাস স্যার বেতনও পাইনি, কীকরে চালাবো স্যার, আর পারছি না…! 
কর্তা শুনে বললেন,
‘হুঁ, তাই তাে !আমারও হাতে যে আর একটাও টাকা নেই… ‘

জানো বাবা, এরপর উনি ফোনটা কেটে দিলেন!জাস্ট কেটে দিলেন!ভাবো,আমার জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সময়,আমার রক্ত-ঘাম-শ্রম যার জন্য দিয়েছি সেই তিনি…!

ঘরে তোমার নাতিটা আজ তিন বছর বেকার।প্রতিদিন  তার ডিপ্রেশনের ওষুধ লাগে।আমারও সুগার-প্রেসার,ওষুধ লাগে।তোমার বৌমার কোমর, হাঁটুর হাড়ে ক্ষয়রোগ, তার লাগে ক্যালসিয়াম,লাগে ভিটামিন।এদিকে টিভি, খবরের কাগজে বলছে বাঁচতে গেলে এখন ইমিউনিটি লাগে,ইমিউনিটি চাই …. বাবা, সব লাগাতেই যা লাগে তা যে আমার শেষ বাবা…’

এক নিঃশ্বাসে প্রতিম কথাগুলো বলার পর, ঝাপসা চোখ পরিষ্কার করে যখন আবার আয়নার দিকে তাকালো, তখন আর ওর বাবাকে দেখতে পেল না।

আয়নার যতটা গভীরে দেখা যায় তার চেয়েও বেশি গভীরে সে দেখার চেষ্টা করলো,কিন্তু নিজেকে ছাড়া সে আর কিছুই দেখতে পেল না।

4 thoughts on “ইমিউনিটি”

  1. অসাধারণ গল্প, তবে এ তো আজ গল্প নয়, ভীষণ বাস্তব একটা ছবি আমাদের সমাজের। খুব ভালো লাগ।

  2. বাস্তব জীবনের প্রতিচ্ছব। ভালো লাগলো।

Leave a Reply

Your email address will not be published.